জাতীয়

ভারত, উগান্ডার পর ঘুষের তথ্য জানাতে বাংলাদেশে ওয়েবসাইট, কতটা সফল হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩০ সকাল
ভারত, উগান্ডার পর ঘুষের তথ্য জানাতে বাংলাদেশে ওয়েবসাইট, কতটা সফল হবে
ছবি: প্রথম আলো

সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায় কত টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে—সেই অভিজ্ঞতা জানানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) নামের ওয়েবসাইটটিতে নাগরিকেরা জানাতে পারছেন, কোন দপ্তরে কী সেবার জন্য কত টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, এর উদ্দেশ্য নিছক অভিযোগ জমা নেওয়া নয়; বরং এসব তথ্য এক জায়গায় এনে নাগরিকদের ঘুষের ধরন ও প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।

তবে ধারণাটি একেবারে নতুন নয়। দেড় দশক আগে প্রতিবেশী ভারতে শুরু হয়েছিল ‘আই পেইড আ ব্রাইব’ নামের একটি উদ্যোগ। পরে উগান্ডা, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, সিয়েরা লিওনসহ নানা দেশেও ঘুষের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ ও প্রকাশের একই ধরনের প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছে। কোথাও সেসব উদ্যোগ সরকারি সংস্থার নজরে এসেছে, কোথাও আবার টেকেনি বেশি দিন।

সম্প্রতি ভারতে ‘ব্রাইবস ডট এফওয়াইআই’ নামের নতুন একটি উদ্যোগ বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরপরই হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা এই মডেলের সীমাবদ্ধতাগুলোও সামনে এনেছে। প্রশ্ন উঠছে, কেবল ঘুষের তথ্য সংগ্রহ করে কি ঘুষ কমানো যায়? বাংলাদেশের ‘ঘুষ.সাইট’-ই বা কতটা সফল হতে পারবে?

শুরুটা বেঙ্গালুরুতে

২০১০ সালে ভারতের বেঙ্গালুরুতে ‘আই পেইড আ ব্রাইব’ ওয়েবসাইটটি চালু করে নাগরিক সংগঠন জনাগ্রহ সেন্টার ফর সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ডেমোক্রেসি। সংগঠনটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রমেশ রামানাথন ও স্বাতী রামানাথন দম্পতি।

ধারণাটি ছিল সহজ। সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কেউ ঘুষ দিলে, ঘুষ দিতে অস্বীকার করলে কিংবা ঘুষ ছাড়াই সেবা পেলে—সেই অভিজ্ঞতা ওয়েবসাইটে জানাতে পারতেন। এসব তথ্য এক জায়গায় জড়ো করে কোন দপ্তরে, কী ধরনের সেবায় এবং কত টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে তার একটি চিত্র দাঁড় করানোই ছিল উদ্যোগটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

ভারতের গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, ২০১৭ সালের মধ্যে সাইটটিতে দেড় কোটির বেশি ভিজিট এবং ৩৬ হাজারের বেশি ঘুষের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। জনাগ্রহের উদ্যোগে আরও কয়েকটি দেশেও চালু হয়েছিল একই ধরনের প্ল্যাটফর্ম। সে সময় এই উদ্যোগের কিছু প্রশাসনিক প্রভাবও চোখে পড়েছিল—নাগরিকদের জমা দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল বলেও গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়।

তবে ‘আই পেইড আ ব্রাইব’ এখন আর সচল নেই। সাইটটি ঠিক কবে বন্ধ হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্যও মেলে না। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে এই মডেল কতটা টেকসই, সেটিও থেকে যায় প্রশ্ন হয়ে।

উগান্ডা, কেনিয়া, নাইজেরিয়া

ভারতের উদ্যোগটি পরে অনুসরণ করা হয় অন্য দেশেও। উগান্ডায় অ্যাকশনএইড ইন্টারন্যাশনাল একই নামে চালু করে একটি ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ। সেখানে নাগরিকেরা পুলিশ, হাসপাতাল, স্থানীয় সরকারসহ নানা প্রতিষ্ঠানে ঘুষ দাবি বা লেনদেনের ঘটনা বেনামে জানাতে পারেন। অভিযোগের পর একটি ট্র্যাকিং কোড দিয়ে তার অগ্রগতি অনুসরণেরও সুযোগ রাখা হয়েছে। ওয়েবসাইটটি এখনো চালু।

কেনিয়ায় ২০১১ সালে চালু হয়েছিল ‘হাতারি’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটরের ওই সময়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নাগরিকেরা টেক্সট মেসেজ, ই-মেইল কিংবা টুইটের মাধ্যমে ঘুষের ঘটনা জানাতে পারতেন, পরে সেসব দেখানো হতো মানচিত্রে।

সিয়েরা লিওনেও দুর্নীতি দমন কমিশন চালু করেছিল ‘পে নো ব্রাইব’ নামের একটি উদ্যোগ। অনলাইন, মোবাইল অ্যাপ ও টোল-ফ্রি হটলাইনের মাধ্যমে সেখানে বেনামে অভিযোগ জানানোর সুযোগ ছিল। নাইজেরিয়াতেও ২০১৭ সালে চালু হয় ‘রিপোর্ট ইওরসেলফ’ নামের একটি ওয়েবভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নাগরিকেরা জানাতে পারতেন ঘুষ চাওয়া বা দেওয়ার অভিজ্ঞতা।

এসব উদ্যোগের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন থেকেই গেছে—অভিযোগের তথ্য সংগ্রহের পর সে তথ্য দিয়ে বাস্তবে কী পরিবর্তন আনা হয়েছে?

তবে এসব উদ্যোগ ঘিরে একটি প্রশ্ন থেকেই গেছে—অভিযোগের তথ্য সংগ্রহের পর সেই তথ্য দিয়ে বাস্তবে কী পরিবর্তন আনা গেছে? অভিযোগের সংখ্যা বাড়া আর ঘুষ কমে যাওয়া যে এক জিনিস নয়, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাগুলোর সবচেয়ে বড় শিক্ষা সেটিই।

ভারতে হঠাৎ বন্ধ হওয়া সাইট

ওয়েবসাইটে ঘুষের তথ্য জানানোর এই মডেল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় চলতি বছর ভারতে ‘ব্রাইবস ডট এফওয়াইআই’ চালুর পর। ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, ২০ বছর বয়সী এক প্রকৌশল শিক্ষার্থী গত জুলাইয়ে সাইটটি চালু করেন।

ব্যবহারকারীরা সেখানে জানাতে পারতেন—কোন দপ্তরে কত টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছে, ঘটনাটি কোথায় ঘটেছে এবং তাঁরা ঘুষ দিয়েছেন কি না। অল্প সময়েই উদ্যোগটি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কিন্তু ১৯ আগস্ট হঠাৎই সাইটটি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেন উদ্যোক্তারা।

এনডিটিভির ১৯ আগস্টের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, শেষ ৪৮ ঘণ্টায় প্ল্যাটফর্মটিতে আসে ৫০ লাখের বেশি অনুরোধ, যুক্ত হন প্রায় দুই লাখ নতুন ব্যবহারকারী। এত বিপুল চাপ সামলাতে গিয়েই ফুরিয়ে যায় প্ল্যাটফর্মটির সক্ষমতা। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, এত মানুষের চাপ সামলানোর মতো প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তাঁদের ছিল না; ছিল না এত মানুষের সংবেদনশীল তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও।

বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, কোনো উদ্যোগ ছোট পরিসরে শুরু করা সহজ, কিন্তু সেটি হঠাৎ জনপ্রিয় হয়ে গেলে তথ্যের নিরাপত্তা, ভুয়া অভিযোগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আইনি ঝুঁকি সামলানো অনেক কঠিন হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, বাংলাদেশের ‘ঘুষ.সাইট’-এর জন্য ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। কারণ ছোট পরিসরে কোনো উদ্যোগ শুরু করা সহজ, কিন্তু হঠাৎ জনপ্রিয় হয়ে গেলে তথ্যের নিরাপত্তা, ভুয়া অভিযোগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আর আইনি ঝুঁকি সামলানো হয়ে ওঠে অনেক কঠিন।

পাঁচ দিনে ৬৬ কোটি টাকার অভিযোগ

ভারতের ওই সাইট থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই গত ২১ আগস্ট দেশে ‘ঘুষ.সাইট’ চালু করেছেন দুই উদ্যোক্তা—সাইফ কবির ও শাহেদ শরিফ। চালুর পরপরই সাইটটি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, সাড়াও মিলছে ব্যাপক। এ পর্যন্ত পাঁচ দিনে জমা পড়েছে ৩ হাজার ৮০০-র বেশি অভিযোগ, আর সেসব অভিযোগে দাবিকৃত ঘুষের পরিমাণ প্রায় ৬৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

ওয়েবসাইটটিতে অভিযোগের সঙ্গে দেওয়া যায় দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, এলাকা, কত টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত কী হয়েছে—এসব তথ্য। তবে অভিযোগকারীর ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ করা হয় না। এ ক্ষেত্রে ভুয়া অভিযোগের আশঙ্কার কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা।

বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার ঘুষ

বাংলাদেশে ঘুষ ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। প্রতিবছর সেবা খাতে দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করে সংস্থাটি।

টিআইবির ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে ঘুষ লেনদেন হয়েছে মোট ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। জরিপে অংশ নেওয়া ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার মনে করে, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন।

পরিচয় গোপন রেখে ঘুষের অভিজ্ঞতা জানানোর সুযোগ তৈরি হওয়া ইতিবাচক।
— ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি

এই বাস্তবতায় ঘুষের অভিজ্ঞতা জানানোর প্ল্যাটফর্মটিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পরিচয় গোপন রেখে ঘুষের অভিজ্ঞতা জানানোর সুযোগ তৈরি হওয়া ইতিবাচক। নাগরিকেরা ঘুষের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা জানানোর সুযোগ পেয়েছেন—এটি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে তাঁর মতে, জমা হওয়া তথ্য দিয়ে উদ্যোক্তারা শেষ পর্যন্ত কী করেন—প্রভাবটা নির্ভর করবে অনেকটা সেখানেই। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরকে জানানো গেলে এবং তাদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা গেলে উদ্যোগটি কাজে আসতে পারে। তিনি আরও বলেন, মানুষের দেওয়া তথ্য যদি কোনো কাজে না আসে, তাহলে একপর্যায়ে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। তাই তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি তা বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জানানো এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

গবেষণা যা বলছে

ইউরোপিয়ান ইকোনমিক রিভিউ জার্নালে ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কেবল বেনামে ঘুষের অভিজ্ঞতা জানানোর প্ল্যাটফর্ম থাকলেই ঘুষ কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম তুলনামূলক বেশি কার্যকর হতে পারে তখনই, যখন সেখানে ঘুষের পরিমাণ ও ঘটনার স্থান নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকে এবং নাগরিকেরা সেই তথ্য কাজে লাগিয়ে অপেক্ষাকৃত কম দুর্নীতিগ্রস্ত সেবা বা দপ্তর শনাক্ত করতে পারেন।

ভারতের ‘আই পেইড আ ব্রাইব’-এর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠান যখন এসব তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে, তখন প্রভাব তৈরির সুযোগ থাকে। অন্যদিকে উগান্ডা, কেনিয়া বা নাইজেরিয়ার উদ্যোগগুলোর ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদে ঘুষ কমানোর সরাসরি প্রমাণ স্পষ্ট নয়।

সাইটটির উদ্যোক্তারা অবশ্য বলছেন, সেবাগ্রহীতাদের আগেভাগে সতর্ক করাও তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য। সাইফ কবির প্রথম আলোকে বলেন, কত মানুষ অভিযোগ করল সেই সংখ্যা তাঁদের সাফল্য নয়; বরং মানুষ আগেভাগেই সরকারি সেবার খরচ সম্পর্কে জেনে ঘুষ চাইলে যেন তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে, সেটিই তাঁদের লক্ষ্য।

আপাতত সাইটটি সচল রাখাই তাঁদের পরিকল্পনা বলে জানান এই উদ্যোক্তা। এরপর নজর দিতে চান ডেটার মান বাড়ানোয়, যাতে কোন দপ্তরে কোন সেবায় কী ঘটছে তার হিসাব বিশ্বাসযোগ্যভাবে মেলানো যায় এবং জেলা ধরে ধরে কভারেজও বাড়ে। তথ্যভান্ডারটি এমনভাবে খোলা রাখতে চান, যেন সাংবাদিক আর গবেষকেরা নিজেরাই তা ঘেঁটে দেখতে পারেন।

সূত্র: প্রথম আলো

৮ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

প্রতারণার মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিদিশা কারাগারে

প্রতারণার মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিদিশা কারাগারে