জাতীয়

এজলাস থেকে নথি চুরি, কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে লেখা হতো ভুয়া রায়

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৬ আগস্ট ২০২৬, ৮:৪৬ সকাল
এজলাস থেকে নথি চুরি, কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে লেখা হতো ভুয়া রায়
ছবি: প্রথম আলো

প্রথমে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাস থেকে চুরি যায় একটি অস্ত্র মামলার নথি। এর কিছুদিন পর ঠিক একই কায়দায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-৮ আদালত থেকে উধাও হয় একটি মাদক মামলার নথি।

দুটি ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, দুই চুরির পেছনেই রয়েছেন একই ব্যক্তি—নিজেকে আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দেওয়া আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেল। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে নিম্ন আদালতপাড়ায় জাল কাগজপত্র বানানোর তথ্য।

আদালতপাড়ার কম্পিউটার কম্পোজের দোকান থেকে ইতিমধ্যে উদ্ধার হয়েছে বিভিন্ন মামলার ভুয়া খালাসের রায় ও আদেশের কপি। পুলিশের ধারণা, আদালতের নথি চুরি করে সেগুলোর আদলেই নিখুঁতভাবে তৈরি করা হতো জাল কাগজপত্র আর ভুয়া রায়ের কপি।

এজলাস থেকে নথি গায়েবের ঘটনায় আনোয়ারুল হক ছাড়াও গ্রেপ্তার হয়েছেন তাঁর সহযোগী কম্পিউটার অপারেটর আহসান হাবীব। ধরা পড়েছেন নথি চুরি হওয়া অস্ত্র মামলার আসামি তানভীর আহমেদ তনয় ওরফে রাব্বীর স্ত্রী জামিলা আক্তার ওরফে অর্পাও। চক্রের বাকি সদস্যদের শনাক্ত ও জাল সিল উদ্ধারে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

৯০ হাজার টাকায় খালাসের চুক্তি

আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর খিলগাঁও থানার একটি অস্ত্র মামলার আসামি তানভীর আহমেদ তনয় ওরফে রাব্বী চার-পাঁচ বছর ধরে পলাতক; এখন তিনি আছেন সৌদি আরবে। অন্যদিকে তানভীরের মামা রবিউল হক ভাটারা থানার একটি মাদক মামলার আসামি, তিনিও পলাতক।

নিজেকে আইনজীবীর সহকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে আনোয়ারুল দুই আসামির মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে জামিলার কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা নেওয়ার চুক্তি করেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, পলাতক এই দুই আসামিকে মামলা থেকে পুরোপুরি খালাস করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তানভীরের স্ত্রী জামিলা আক্তার ওরফে অর্পার সঙ্গে যোগাযোগ করেন আনোয়ারুল হক। অন্য একটি মামলার কাজে আদালতে যাতায়াতের সূত্রেই জামিলার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। নিজেকে আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দিয়ে দুই আসামির মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে জামিলার কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা নেওয়ার চুক্তি করেন তিনি। টাকাটা তিনি নেন জামিলার মায়ের বাসায় গিয়ে।

এজলাস থেকে মূল নথি চুরি

সূত্র জানায়, টাকা হাতে পাওয়ার পর আনোয়ারুল প্রথমে জামিলাকে বানিয়ে দেন একটি ভুয়া খালাসের নথি। কিন্তু কিছুদিন পর আদালত থেকে আবার আসামিকে হাজির হওয়ার সমন গেলে জামিলার মনে খটকা লাগে। তিনি আনোয়ারুলের কাছে বিষয়টি জানতে চান। জালিয়াতিটা ধামাচাপা দিতে এবং মামলা সত্যিই খালাস হয়েছে বলে দেখাতে তখন আদালত থেকে মামলার মূল নথিটিই চুরির পরিকল্পনা করেন আনোয়ারুল।

সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২ জুলাই বেলা ২টা ২০ মিনিটের দিকে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাসে ঢোকেন তিনি। আইনজীবীর সহকারী দাবি করে খিলগাঁও থানার ওই অস্ত্র মামলার নথিটি দেখতে চান। আদালতের উমেদার নাজমুল হাসান তাঁকে নথিটি দেখতে দিয়ে বিচারকের ডাকে পাশের খাসকামরায় যান। মিনিট পাঁচেক পর ফিরে এসে নাজমুল দেখেন—আনোয়ারুলও নেই, মামলার নথিটিও নেই।

মামলার তদন্তে নেমে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ আদালতের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নথি চুরির জন্য আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেলকে শনাক্ত করে।

ঘটনার দিনই সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী খায়রুল আলম বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় নথি চুরির মামলা করেন। খায়রুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অস্ত্র মামলার আসামি তানভীর পলাতক থাকায় আমরা সমন পাঠিয়েছিলাম। আসামি আসেনি, মামলা চলমান। আমরা আনোয়ারুলকে আগে থেকে চিনতাম না, শুধু জানতাম সে আইনজীবীর সহকারী।’

এরপর মাদক মামলার নথি

প্রথম চুরির পর ৩ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-৮ আদালতে গিয়ে একইভাবে রবিউল হকের বিরুদ্ধে হওয়া মাদক মামলার নথি দেখতে চান আনোয়ারুল। সেটিও চুরি করে নিয়ে যান তিনি। এ ঘটনায় আদালতের অফিস সহায়ক সুমন তালুকদার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় করেন আরেকটি মামলা।

দুই মামলার তদন্তে নেমে কোতোয়ালি থানার পুলিশ আদালতের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নথি চোর হিসেবে শনাক্ত করে আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেলকে। গত ২১ আগস্ট ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে শ্যামপুরের একতা হাউজিং এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, আনোয়ারুল কাজ করতেন আইনজীবী আবদুস সাত্তারের চেম্বারে, পিয়ন হিসেবে। আইনজীবী আবদুস সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আনোয়ারুলের কাজ ছিল চা আনা ও ফাইল রক্ষণাবেক্ষণ করা। প্রায় আড়াই বছর তাঁর চেম্বারে কাজ করার পর চলতি বছরের ১৬ মার্চ থেকে হঠাৎ সে কাজে আসা বন্ধ করে দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আনোয়ারুল আমার চেম্বার ছাড়ার আগে সব মক্কেলের ফোন নম্বর ছবি তুলে নিয়ে যায়। পরে সে আমার ক্লায়েন্টদের ফোন দিয়ে মামলা খালাস ও জামিন করিয়ে দেওয়ার নাম করে প্রতারণা শুরু করে। সে আমার আরেক ক্লায়েন্টের কাছ থেকে জামিন করানোর কথা বলে দুই হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল।’

কম্পিউটারের ফোল্ডারে ১০ মামলার ভুয়া রায়

আনোয়ারুলের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিম্ন আদালতপাড়ার কম্পিউটার অপারেটর আহসান হাবীবকে। তাঁর কম্পিউটারের একটি ফোল্ডার থেকে জামিলাকে দেওয়া দুই মামলার খালাসের ভুয়া রায়সহ অন্তত ১০টি মামলার ভুয়া রায় ও আদেশের কপি উদ্ধার করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দেবাশীষ হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, হাবীবের কম্পিউটারে আদালতের এই নথিগুলো কীভাবে এল এবং চুরির পেছনে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে জালিয়াতিতে ব্যবহৃত নকল সিলগুলো এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

জামিলার স্বীকারোক্তি

গ্রেপ্তারের পর গত ২১ আগস্ট জামিলা ও আনোয়ারুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের মাধ্যমে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। গত সোমবার জামিলা ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীরের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন, পরে তাঁকে পাঠানো হয় কারাগারে। আনোয়ারুল ও কম্পিউটার অপারেটর আহসান হাবীব এখনো রিমান্ডে রয়েছেন।

জামিলার আইনজীবী আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘জামিলা আদালতের নথি চুরির বিষয়ে কিছুই জানতেন না। ওই ব্যক্তি (আনোয়ারুল) নিজেকে আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দিয়ে মামলা খালাস করিয়ে দেওয়ার কথা বলে তাঁর সঙ্গে চুক্তি করেন। পরে সেই ব্যক্তি আদালত থেকে মামলার মূল নথি চুরি করে জামিলাকে বলেন, “এটি আপনার স্বামীর খালাসের কাগজ, এটি যত্ন করে রাখুন।” জামিলা সরল বিশ্বাসে নথিটি বাসায় রেখে দিয়েছিলেন। তিনি যদি জানতেন এটি চুরি করা নথি, তবে কখনোই নিজের ঘরে রাখতেন না।’

আদালতের এজলাস থেকে নথি চুরি এবং ভুয়া রায় তৈরি করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। এই জালিয়াতি চক্রের কঠোর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।
— ওমর ফারুক ফারুকী, পিপি, ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আদালতের এজলাস থেকে নথি চুরি এবং ভুয়া রায় তৈরি করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। এই জালিয়াতি চক্রের কঠোর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে যদি কোনো আইনজীবীও জড়িত থাকেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাঁর বার কাউন্সিল সদস্যপদ বাতিল করা হবে।’

সূত্র: প্রথম আলো

৩ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

দুই আসামির ডোপ টেস্ট হবে, হত্যাকাণ্ড ঘিরে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আশ্বাস

দুই আসামির ডোপ টেস্ট হবে, হত্যাকাণ্ড ঘিরে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আশ্বাস