শিক্ষা
‘লিখতে হবে মনের টানে, খ্যাতি বা টাকার জন্য নয়’
নিজস্ব প্রতিবেদক · ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৮ সকাল
লেখালেখি কেবল শব্দ সাজানোর কাজ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাঠ, পর্যবেক্ষণ, অনুভূতি আর জীবনের গভীর উপলব্ধি। প্রথম আলো বন্ধুসভার ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’-এ নতুন লেখকদের উদ্দেশে এই পরামর্শই দিয়েছেন বক্তারা। কথাসাহিত্য থেকে কবিতা, ফিচার থেকে অনুবাদ কিংবা বই প্রকাশ — লেখার নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন দেশসেরা কথাসাহিত্যিক, কবি, অনুবাদক, সম্পাদক ও প্রকাশকেরা। তাঁদের কথা: ভালো লিখতে হলে পড়তে হবে, সংবেদনশীল হতে হবে, আর নিজের লেখাকে বারবার দেখতে হবে পাঠকের চোখে।
শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সভাকক্ষে হয় দিনব্যাপী এই উৎসব। সকাল সাড়ে ৯টায় সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন, যাতে অংশ নেন সারা দেশের নির্বাচিত লেখক বন্ধুরা।
‘ভ্রমণ ও অনুবাদ’ নিয়ে আলোচনায় ছিলেন অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দিন। তাঁর মতে, একজন অনুবাদককে হতে হয় সৃষ্টিশীল। মূল বিষয়টি বুঝতে হলে যে ভাষা থেকে অনুবাদ করা হচ্ছে, সেই ভাষা ও সেই দেশের সংস্কৃতি-জীবনযাত্রা সম্পর্কেও জানা চাই; নইলে ভালো অনুবাদ হবে না।
ভ্রমণকাহিনি বা সাহিত্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেখানে যাচ্ছেন সেখানকার মানুষের চরিত্র, জীবনযাপন, ইতিহাস ও সংস্কৃতি লেখায় থাকতে হবে।
কবি ও প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ মনে করেন, অনুভূতি প্রকাশ করলেই তা কবিতা হয়ে ওঠে না। তিনি বলেন, ‘অনুভূতিকে ভাষার মধ্য দিয়ে সর্বজনীন করতে পারলেই কবিতা হয়ে উঠবে। কোনো প্রবন্ধে যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়, সেটি যখন কবিতার মধ্যে ঢোকে তখন অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়। আমরা যে কবিতা পড়ি, গল্প পড়ি, সিনেমা দেখি—এগুলো আমাদের নতুন একটা পৃথিবী দেখায়।’
লেখার ক্ষেত্রে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল। তাঁর কথা, লেখকের কাজ লিখে যাওয়া। লেখক, পাঠ্য ও পাঠক আলাদা; পাঠকের অংশগ্রহণ ও মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই সাহিত্য শিল্পে পরিণত হয়।
উৎসবের আয়োজন সহযোগী ছিল মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (কমিউনিকেশন) রুখসানা মিলি তরুণ লেখকদের শুভকামনা জানিয়ে বলেন, ‘লেখার কৌশল নিয়ে আজ আপনারা যা শুনছেন, শিখছেন তা অনেক বড় পাওয়া।’
অনুষ্ঠানে ছিল লেখক-প্রকাশক-সম্পাদক আলাপচারিতাও। এই পর্বে সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ বলেন, বই বের করার জন্য প্রস্তুতি দরকার; কিন্তু সেই প্রস্তুতির ধৈর্য এখনকার লেখকদের মধ্যে কম। এই জায়গাটায় ধৈর্য লাগবে, আর লেখায় কঠিন শব্দ রাখা যাবে না।
বাতিঘরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান সম্পাদক জাফর আহমদ রাশেদ বলেন, প্রকাশকের কাছে পাণ্ডুলিপি পাঠাতে হবে সম্পূর্ণ করে — সূচিপত্র, পৃষ্ঠা নম্বর, লেখক পরিচিতি, ভূমিকা, বইয়ের সারসংক্ষেপসহ; সঙ্গে লিখতে হবে বইটি কেন প্রকাশযোগ্য, সে কথাও।
‘ফিচার ও সংবাদ’ নিয়ে বলতে গিয়ে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন মনে করিয়ে দেন, ফিচারও সাংবাদিকতারই একটি অংশ। ফিচার লিখতে হবে সঠিক তথ্য ব্যবহার করে, সাহিত্যিক ঢঙে। শিরোনামে থাকতে হবে এমন কিছু শব্দ, যা পাঠককে আকৃষ্ট করবে। লেখায় শব্দ নিতে হবে বাস্তব জীবন থেকে, আর পাঠককে দিতে হবে নতুন তথ্য।
লেখকজীবনের সংগ্রামের প্রসঙ্গ উঠে আসে কথাসাহিত্যিক ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হকের কথায়। তিনি বলেন, ‘শিল্পী হওয়া মানেই ব্যর্থ হওয়া। আর ব্যর্থ হলেই শিল্পী হবেন। মনে রাখবেন লেখালেখি করে কখনো প্রশংসিত হবেন না। অনেকেই সমালোচনা করবে। খ্যাতির জন্য লিখবেন না। টাকার জন্য লিখবেন না।’ তাহলে কেন লিখব — এই প্রশ্নের জবাবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘বলিয়া লিখিয়া যদি দেশের মানুষের উপকার করিতে পারো, সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারো, তাহলে লেখো।’
লেখালেখির কোনো সর্বজনীন সূত্র নেই বলে উল্লেখ করেন কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন। তাঁর কথা, লিখতে হলে পড়তে হবে প্রচুর; সঙ্গে দরকার অনুভূতিপ্রবণতা, পর্যবেক্ষণক্ষমতা ও সংবেদনশীলতা। স্পর্শিত হওয়াটা খুব জরুরি, আর তা সম্ভব হয় সংবেদনশীল হলেই।
বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা ভালো লিখছেন এবং লিখবেন বলে আমরা আশাবাদী।’
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন উৎসবের আহ্বায়ক সৌমেন্দ্র গোস্বামী। অনুভূতি প্রকাশ করেন বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের উপদেষ্টা উত্তম রায়, সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী ফিরোজ ও রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সাইমুম মৌসুমী বৃষ্টি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা মুহসিনা বুশরা, সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদ ইমাম ও কার্যনির্বাহী সদস্য তাপসী রায়।
শেষ দিকে ঘোষণা করা হয় ‘লেখক বন্ধু পুরস্কার ২০২৬’ বিজয়ীদের নাম। তাঁরা হলেন ভৈরব বন্ধুসভার আফিফুল ইসলাম, ময়মনসিংহ বন্ধুসভার মো. আবুল বাশার, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার খোন্দকার হুমায়ূন কবীর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার নুসরাত রুষা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার জাসেদুল ইসলাম। ২০২৫-২৬ সালে বন্ধুসভার ওয়েবসাইটে ও স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশিত লেখার জন্যই এই পুরস্কার পেয়েছেন তাঁরা।
লেখালেখি কর্মশালার মূল্যায়নে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া পাঁচজনের হাতেও পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়েছে — যথাক্রমে বদরুল হাসান, সাব্বির আহমেদ, তাসফিয়া তাসমিন, নুসরাত ভূঁইয়া ও শহীদুল আলম। এ ছাড়া চিঠি লেখা প্রতিযোগিতার সেরা তিনজন শারমিন সুলতানা, ভূঁইয়া শফি ও তাজিন সুরভীকেও দেওয়া হয়েছে পুরস্কার।
সূত্র: প্রথম আলো — https://www.prothomalo.com/bangladesh/wlor7672gk
বিষয়:: সাহিত্য · লেখক · উৎসব
https://news.rayenda.com/bn/education/2weavm