আন্তর্জাতিক
নেপালে বন্যা-ভূমিধসে নিহত বেড়ে ১৫৭, নিখোঁজ ৪০৩
নিজস্ব প্রতিবেদক · ২৬ আগস্ট ২০২৬, ৬:০৯ সন্ধ্যা
নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মারা গেছেন অন্তত ১৫৭ জন, নিখোঁজ আরও অন্তত ৪০৩ জন। তাঁদের অধিকাংশই বিদেশি পর্যটক বলে জানা গেছে। বুধবার দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায় ঘটে এই দুর্যোগ।
নেপাল পুলিশের পক্ষ থেকে স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপদ্রুত এলাকাগুলো থেকে ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রসুয়ায় একজন, নুয়াকোটে ১১ জন, ধাদিংয়ে ১৮ জন, চিতওয়ানে ৩৩ জন, গোর্খায় ১৯ জন, তানাহুঁতে সাতজন এবং নওয়ালপুরে ১১ জন।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের তথ্যমতে, নিখোঁজ ৪০৩ জনের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক — ভারতের ১৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন ও যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ২০০ জন নারী ও ২০৩ জন পুরুষ। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ২৬টি দেশের নাগরিক। নিখোঁজ রয়েছেন ৬১ জন নেপালিও।
ট্যুর অপারেটরদের বরাত দিয়ে পর্যটন বোর্ড আরও জানিয়েছে, নিখোঁজদের বেশির ভাগই যাচ্ছিলেন ভারত ও নেপালের সীমান্তবর্তী মানস সরোবরের উদ্দেশে।
স্থানীয় বাসিন্দা রাজু ভাদেল (৫৬) বলেন, ‘আজ (বুধবার) সকালে আমার ভগ্নিপতি আমাকে ফোন করেছিলেন। তাঁরা কাঁদছিলেন এবং বলছিলেন যে তাঁদের পুরো বাড়িটি বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করা গেলেও তাঁর ভাই এখনো নিখোঁজ।’
নেপাল পুলিশের প্রকাশ করা ছবিতে দেখা গেছে, নদীর তীব্র তোড়ে ভেসে যাচ্ছে বাড়িঘর। বার্তা সংস্থা এএফপির ছবিতে দেখা যায়, কাদামাটির নিচ থেকে একটি বাড়ির শুধু ওপরের অংশটুকুই দৃশ্যমান।
দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে তাদের প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, দুর্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় পুলিশের এক মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো স্পষ্ট নয়; তবে নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সতর্ক করা হয়েছে। নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, উপদ্রুত এলাকায় তারা হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলাকর্মী মোতায়েন করেছে।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, এই বন্যায় তিব্বতের গিরংয়ে তিনজন মারা গেছেন, নিখোঁজ অন্তত ২৬৫ জন। নেপাল সীমান্তের তিব্বত বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসে ‘ব্যাপক হতাহতের’ ঘটনা ঘটেছে বলেও জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিখোঁজদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন।
২০১৫ সালের প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের পর নেপালে এটিকেই সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হচ্ছে। ঠিক কী কারণে হঠাৎ এমন বন্যা ও ভূমিধস, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, বুধবার তিব্বত অঞ্চলে ভূমিকম্পের পরই এর সূত্রপাত।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে জানান, ভূমিকম্পটি হয় স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে; এর তিন মিনিটের মাথায়, অর্থাৎ ৮টা ৪০ মিনিটে শুরু হয় আকস্মিক বন্যা। তিনি বলেন, ‘তবে এটা আমাদের যাচাই করে দেখতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অঞ্চলে অনুভূত ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪, উৎপত্তিস্থল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদ থেকে ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।
জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে প্রায়ই প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধস হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রকোপ ও ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছে।
দ্রুত আরেকটি বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (ইসিমোড) জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং। তিনি এএফপিকে বলেন, নেপাল-চীন সীমান্ত নদীর উজানে এখনো প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে; ফলে যেকোনো সময় দ্বিতীয় দফায় বন্যা দেখা দিতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেছেন, প্রাণঘাতী এই আকস্মিক বন্যায় তাঁর হৃদয় ভারাক্রান্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিতে পুরো জাতি স্তম্ভিত ও গভীরভাবে মর্মাহত। দুর্যোগটিকে তিনি ‘আকস্মিক’ ও ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেন।
উদ্ধার অভিযান শুরু করতে সরকার কোনো বিলম্ব না করে তাৎক্ষণিকভাবে সব ধরনের সম্পদ ও সক্ষমতা কাজে লাগিয়েছে বলেও জানান তিনি।
সূত্র: প্রথম আলো — https://www.prothomalo.com/world/asia/xkw4dd07zt
বিষয়:: নেপাল · বন্যা · নিখোঁজ
https://news.rayenda.com/bn/international/gzz8e4