রায়েন্দা নিউজ

news.rayenda.com · ছাপার তারিখ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬

স্বাস্থ্য

দুই মাসেই এডিসের ঘনত্ব দ্বিগুণ, রাজশাহীতে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক · ২৮ আগস্ট ২০২৬, ৭:৫৮ সকাল

দুই মাসেই এডিসের ঘনত্ব দ্বিগুণ, রাজশাহীতে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি
ছবি: জাগো নিউজ

রাজশাহীতে দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। একদিকে নগরীতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজনন ঘনত্ব বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে, অন্যদিকে হাসপাতালে বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপে নগরীতে এডিস মশার প্রজনন ঘনত্বের ব্রেটো সূচক পাওয়া গেছে ৬১ দশমিক ৩৩।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্রেটো সূচক ২০ ছাড়ালেই কোনো এলাকা ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই হিসাবে রাজশাহীর বর্তমান সূচক উচ্চ ঝুঁকির নির্ধারিত সীমার তিন গুণেরও বেশি। এর মধ্যেই গত ৪৮ ঘণ্টায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ২১ জন ডেঙ্গু রোগী; বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৪৮ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে নগরীতে এডিস মশার ঘনত্ব প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসের কীটতাত্ত্বিক জরিপে ব্রেটো সূচক ছিল ৩০ দশমিক ৬৬; আগস্টের সর্বশেষ জরিপে তা দাঁড়িয়েছে ৬১ দশমিক ৩৩। অর্থাৎ বর্ষা মৌসুমে অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপকভাবে বেড়েছে এডিসের প্রজনন। এ অবস্থায় সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি আগস্টে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের উদ্যোগে নগরীর কাজিহাটা, চন্ডীপুর, উপরভদ্রা, নামোভদ্রা ও হাজরাপুকুর এলাকায় জরিপ চালানো হয়। ৭৫টি বাড়ি পরিদর্শন করে ২৪টিতেই মেলে এডিস মশার লার্ভা — বাড়ির সূচক দাঁড়ায় ৩২ শতাংশে। একই সময়ে ৬৮টি পানি ধারণকারী পাত্র পরীক্ষা করে ৪৬টিতে লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত হয়, পাত্রের সূচক দাঁড়ায় ৬৭ দশমিক ৬৫ শতাংশে। জরিপের এই ফল নগরীর আবাসিক এলাকাগুলোয় এডিসের প্রজননের ব্যাপকতার উদ্বেগজনক চিত্রই তুলে ধরেছে।

বিভিন্ন প্রজননস্থল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে মোট ৬৮৫টি মশার লার্ভা। এর মধ্যে ৫০৫টি এডিস অ্যালবোপিকটাস, ৮৬টি এডিস ইজিপ্টি এবং ৯৪টি অন্যান্য প্রজাতির। ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস ইজিপ্টির পাশাপাশি এডিস অ্যালবোপিকটাসের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য, যা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন কীটতত্ত্ব-সংশ্লিষ্টরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এডিস মশার বংশবিস্তারে বড় জলাশয় বা নোংরা আবর্জনাপূর্ণ জায়গা লাগে না। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের কোনো অংশে কয়েক দিন পানি জমে থাকলেই সেখানে জন্ম নিতে পারে লার্ভা। তাই কেবল বড় ড্রেন, নালা বা ময়লার স্তূপ পরিষ্কার করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; সমান গুরুত্ব দিতে হবে বাড়ি ও আশপাশের ছোট ছোট পানি জমার জায়গাগুলোতেও।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, রাজশাহীতে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে; বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জে প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। সর্বশেষ ব্রেটো সূচক ৬১ দশমিক ৩৩, যা উচ্চ ঝুঁকির সীমার তিন গুণের বেশি। তাঁর মতে, মে মাসের জরিপেও উচ্চ ঝুঁকির চিত্র মিলেছিল, তখন সূচক ছিল ৩০ দশমিক ৬৬; দুই মাসে তা প্রায় দ্বিগুণ হওয়া পরিস্থিতির অবনতিরই স্পষ্ট ইঙ্গিত।

মশার বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোগীর সংখ্যাও। রামেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ জুন সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন মাত্র একজন ডেঙ্গু রোগী; ৩০ জুলাই তা বেড়ে দাঁড়ায় নয়জনে। এক মাসের ব্যবধানে সংখ্যাটি বেড়েছে কয়েক গুণ — সর্বশেষ ২৮ আগস্ট রোগীর সংখ্যা ৪৮। এর মধ্যে ৪৮ ঘণ্টাতেই ভর্তি হয়েছেন ২১ জন। রোগীর এই দ্রুত বৃদ্ধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি নগরবাসীর মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়েছে।

রাজশাহী জেলা কীটতত্ত্ববিদ উম্মে হাবিবা বলেন, বছরের পর বছর ধরে নগরীতে মশার লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ মশার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে; সাধারণ গৃহস্থালি সামগ্রীতেও মিলছে এডিসের লার্ভা। তাঁর মতে, কেবল সিটি করপোরেশন বা সরকারি কোনো সংস্থার একক উদ্যোগে এই মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় — নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে, বিশেষ করে বৃষ্টির পর কোথাও পানি জমে আছে কি না তা নিয়মিত দেখতে হবে।

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ জানান, রোগীর সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি হাসপাতালের রয়েছে। একই সঙ্গে বর্ষাকালে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে বিশেষ নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি — কারণ রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগের উৎস ও বাহক নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নানা কার্যক্রমের কথা জানিয়েছে রাজশাহী সিটি করপোরেশনও। সংস্থাটির প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন ডলার বলেন, অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ডেঙ্গু পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে; নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে চলছে পরিচ্ছন্নতা অভিযান। এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সূত্র: জাগো নিউজ — https://www.jagonews24.com/country/news/1151686

বিষয়:: স্বাস্থ্য · ডেঙ্গু · রাজশাহী · এডিস

https://news.rayenda.com/bn/health/qolvn5

আগের