ছায়ায় ঢাকা একটি গ্রাম। বুক চিরে চলে গেছে পাকা সড়ক। সড়কের দুই ধারে গড়ে ওঠা বাড়িগুলোর সামনে সারি সারি গাছ। একটু দূরে ধানখেতে বাতাস আলতো ঢেউ তুলছে। দেখলে মনে হয় যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো ছবি। প্রকৃতির মায়া জড়ানো এই গ্রামটির নাম ‘ধানের শিষ’। রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে থাকা এই গ্রামের এমন নামের পেছনে রয়েছে একটি কাহিনি—যা একদিকে করুণ, অন্যদিকে রক্তাক্ত। নোয়াখালী জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সুবর্ণচর উপজেলার এই গ্রামের প্রবীণেরা সেসব দিনের কথা ভুলে যেতেই চান।
তবে সেই কাহিনিতে ঢোকার আগে গ্রামটির দিকে আরেকবার চোখ বোলানো যাক। ফুলে-ফলে-ফসলে ভরভরন্ত বলতে ঠিক যা বোঝায় তেমন না হলেও, প্রাচুর্যের অভাব এখানে নেই। গত সোমবার গ্রামটি ঘুরে চোখে পড়ল বিস্তীর্ণ ধান ও সবজির আবাদি জমি, সেই সঙ্গে মাছ, মুরগি আর গরুর খামার। এসব খামারের কৃষিপণ্য যাচ্ছে জেলা শহরে। গ্রামের প্রতিটি পুকুরই যেন একেকটি ছোট মাছের খামার। নজরে পড়ল কয়েকটি স্কুল, মসজিদ আর মাদ্রাসাও।
এখানকার বাসিন্দাদের বেশির ভাগই কৃষিনির্ভর। তবে আছেন প্রবাসী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার মানুষ। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গ্রামে বেকার তরুণ-যুবক নেই বললেই চলে। চাকরির পেছনে না ছুটে অনেকেই খামার গড়ে উদ্যোক্তা হয়েছেন। এর বাইরে প্রবাসী আয়ও গ্রামের সচ্ছলতার একটি বড় কারণ। অথচ এখানে বসতি গড়ার শুরুর গল্পটা এমন ছিল না। তখন গ্রামের নাম ছিল পোড়াচর। সেই পোড়াচরই আজকের ধানের শিষ।
চর জেগে ওঠার গল্প
পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে মেঘনার ভাঙনে নদীগর্ভে হারিয়ে যায় নোয়াখালীর পুরোনো শহর (বর্তমান সোনাপুরের দক্ষিণ অংশ)। ভাঙনে বিলীন হয়ে যায় তৎকালীন সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালতসহ গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনা। সেই পরিস্থিতিতে ১৯৫০-৫১ সাল নাগাদ নিরাপদ জায়গা হিসেবে বর্তমান মাইজদীতে সরিয়ে নেওয়া হয় জেলা সদর দপ্তর।
এর এক দশক পর, ১৯৬০ সালের দিকে নদীতে বিলীন হওয়া পুরোনো শহর এলাকার দক্ষিণে নতুন চর জাগতে শুরু করে। এরপর ১৯৭৬-৭৭ সালে মেঘনা গতিপথ বদলায়; নদী সরে যায় বিলীন হওয়া পুরোনো জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। মাঝখানে জেগে ওঠে বেশ কয়েকটি বিশাল চর। সেসব চরেরই একটি আজকের ধানের শিষ গ্রাম।
গ্রামের বাসিন্দা আমান উল্যাহ মাঝি (৮৪) প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের আদি বসতি ছিল হাতিয়া উপজেলায়। নদীভাঙনে সেখানকার বাড়িঘর বিলীন হওয়ার পর ১৯৭৭ সালের শুরুর দিকে তাঁরা মেঘনায় জেগে ওঠা এই নতুন চরে বসবাস শুরু করেন। কাছাকাছি সময়ে আরও অনেকে নদীভাঙা ভূমিহীন হিসেবে এই চর ও আশপাশের চরে বসতি গড়েন। এখানে তাঁদের নিয়ে ছিল প্রায় ৪০০ পরিবার। বেশির ভাগই এসেছিল হাতিয়া থেকে, কিছু পরিবার এসেছিল সন্দ্বীপ, রামগতি ও সদরের কালামুন্সি থেকে। তখন নদী ছিল চর থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে।
সেই রক্তাক্ত আষাঢ়
১৯৭৮ সালের মাঝামাঝি আষাঢ় মাসে পার্শ্ববর্তী চরলক্ষ্মীর দখলদার ব্যক্তিরা চরটির দখল নিতে অতর্কিত হামলা চালিয়েছিল। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল সব বাড়িঘর।
আমান উল্যাহ মাঝি জানান, ১৯৭৮ সালের মাঝামাঝি আষাঢ় মাসে পাশের চরলক্ষ্মীর দখলদারেরা এই চরের দখল নিতে অতর্কিত হামলা চালায়। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় সব বাড়িঘর। খেতের ফসল আর গবাদিপশু লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয় বহু নারী-পুরুষকে। ওই ঘটনায় করা মামলায় পরে ২১ জনের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল।