সারাদেশ
গ্রামের নাম ‘ধানের শিষ’, এমন অদ্ভুত নামকরণের পেছনে যে কাহিনি
নিজস্ব প্রতিবেদক · ২৭ আগস্ট ২০২৬, ৩:০০ রাত
ছায়ায় ঢাকা একটি গ্রাম। বুক চিরে চলে গেছে পাকা সড়ক। সড়কের দুই ধারে গড়ে ওঠা বাড়িগুলোর সামনে সারি সারি গাছ। একটু দূরে ধানখেতে বাতাস আলতো ঢেউ তুলছে। দেখলে মনে হয় যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো ছবি। প্রকৃতির মায়া জড়ানো এই গ্রামটির নাম ‘ধানের শিষ’। রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে থাকা এই গ্রামের এমন নামের পেছনে রয়েছে একটি কাহিনি—যা একদিকে করুণ, অন্যদিকে রক্তাক্ত। নোয়াখালী জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সুবর্ণচর উপজেলার এই গ্রামের প্রবীণেরা সেসব দিনের কথা ভুলে যেতেই চান।
তবে সেই কাহিনিতে ঢোকার আগে গ্রামটির দিকে আরেকবার চোখ বোলানো যাক। ফুলে-ফলে-ফসলে ভরভরন্ত বলতে ঠিক যা বোঝায় তেমন না হলেও, প্রাচুর্যের অভাব এখানে নেই। গত সোমবার গ্রামটি ঘুরে চোখে পড়ল বিস্তীর্ণ ধান ও সবজির আবাদি জমি, সেই সঙ্গে মাছ, মুরগি আর গরুর খামার। এসব খামারের কৃষিপণ্য যাচ্ছে জেলা শহরে। গ্রামের প্রতিটি পুকুরই যেন একেকটি ছোট মাছের খামার। নজরে পড়ল কয়েকটি স্কুল, মসজিদ আর মাদ্রাসাও।
এখানকার বাসিন্দাদের বেশির ভাগই কৃষিনির্ভর। তবে আছেন প্রবাসী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার মানুষ। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গ্রামে বেকার তরুণ-যুবক নেই বললেই চলে। চাকরির পেছনে না ছুটে অনেকেই খামার গড়ে উদ্যোক্তা হয়েছেন। এর বাইরে প্রবাসী আয়ও গ্রামের সচ্ছলতার একটি বড় কারণ। অথচ এখানে বসতি গড়ার শুরুর গল্পটা এমন ছিল না। তখন গ্রামের নাম ছিল পোড়াচর। সেই পোড়াচরই আজকের ধানের শিষ।
চর জেগে ওঠার গল্প
পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে মেঘনার ভাঙনে নদীগর্ভে হারিয়ে যায় নোয়াখালীর পুরোনো শহর (বর্তমান সোনাপুরের দক্ষিণ অংশ)। ভাঙনে বিলীন হয়ে যায় তৎকালীন সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালতসহ গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনা। সেই পরিস্থিতিতে ১৯৫০-৫১ সাল নাগাদ নিরাপদ জায়গা হিসেবে বর্তমান মাইজদীতে সরিয়ে নেওয়া হয় জেলা সদর দপ্তর।
এর এক দশক পর, ১৯৬০ সালের দিকে নদীতে বিলীন হওয়া পুরোনো শহর এলাকার দক্ষিণে নতুন চর জাগতে শুরু করে। এরপর ১৯৭৬-৭৭ সালে মেঘনা গতিপথ বদলায়; নদী সরে যায় বিলীন হওয়া পুরোনো জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। মাঝখানে জেগে ওঠে বেশ কয়েকটি বিশাল চর। সেসব চরেরই একটি আজকের ধানের শিষ গ্রাম।
গ্রামের বাসিন্দা আমান উল্যাহ মাঝি (৮৪) প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের আদি বসতি ছিল হাতিয়া উপজেলায়। নদীভাঙনে সেখানকার বাড়িঘর বিলীন হওয়ার পর ১৯৭৭ সালের শুরুর দিকে তাঁরা মেঘনায় জেগে ওঠা এই নতুন চরে বসবাস শুরু করেন। কাছাকাছি সময়ে আরও অনেকে নদীভাঙা ভূমিহীন হিসেবে এই চর ও আশপাশের চরে বসতি গড়েন। এখানে তাঁদের নিয়ে ছিল প্রায় ৪০০ পরিবার। বেশির ভাগই এসেছিল হাতিয়া থেকে, কিছু পরিবার এসেছিল সন্দ্বীপ, রামগতি ও সদরের কালামুন্সি থেকে। তখন নদী ছিল চর থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে।
সেই রক্তাক্ত আষাঢ়
১৯৭৮ সালের মাঝামাঝি আষাঢ় মাসে পার্শ্ববর্তী চরলক্ষ্মীর দখলদার ব্যক্তিরা চরটির দখল নিতে অতর্কিত হামলা চালিয়েছিল। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল সব বাড়িঘর।
আমান উল্যাহ মাঝি জানান, ১৯৭৮ সালের মাঝামাঝি আষাঢ় মাসে পাশের চরলক্ষ্মীর দখলদারেরা এই চরের দখল নিতে অতর্কিত হামলা চালায়। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় সব বাড়িঘর। খেতের ফসল আর গবাদিপশু লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয় বহু নারী-পুরুষকে। ওই ঘটনায় করা মামলায় পরে ২১ জনের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল।
এই রক্তাক্ত ঘটনার পর চরটিতে ছুটে আসেন স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ অনেকে। জেলা প্রশাসকের সিদ্ধান্তে চরে বসানো হয় একটি পুলিশ ফাঁড়ি। কিছুদিন পর হাতিয়া সফরে আসেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সফরে এসে তিনি পোড়াচরের সার্বিক খোঁজখবর নেন। পরে জেলা প্রশাসনের তরফে নতুন জেগে ওঠা এই চরসহ আশপাশের চরগুলোতে জরিপ চালানো হয়। সেই জরিপেই পোড়াচরের মৌজার নাম হয়ে যায় ধানের শিষ মৌজা। আশপাশের চরগুলোর নাম দেওয়া হয় চর বৈশাখী, ধানসিঁড়ি ও ধানশালিক মৌজা। পরে মৌজার নাম ধরেই পোড়াচর পরিচিতি পায় ধানের শিষ গ্রাম হিসেবে।
ধ্বংস পেছনে ফেলে এগিয়ে চলা
নাম বদলের পর ১৯৭৮ সালের ধ্বংসযজ্ঞ পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে থাকে গ্রামটি। ১৯৯১ সালে এখানে গড়ে ওঠে একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পরে যেটি সরকারীকরণ হয়ে নাম পায় মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এরপর প্রতিষ্ঠিত হয় আরও কয়েকটি নুরানি মাদ্রাসা।
২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ধানের শিষ গ্রামের লোকসংখ্যা ১০ হাজার ৯৭৬, ভোটার ২ হাজার ৯৯৪ জন। প্রধান পেশা কৃষি, এরপরই প্রবাসী, তারপর ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া আছেন সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীসহ নানা পেশার মানুষ। গ্রামের বেকার যুবকেরা গড়ে তুলেছেন ১২টি মাছের খামার ও ৮টি মুরগির খামার। গ্রামীণ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রাখছে এসব উদ্যোগ।
এখানকার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নুরানি মাদ্রাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের অনেকেই পাশের গ্রামের মাদ্রাসা ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েছেন। গ্রামের অর্ধশতাধিক তরুণ-তরুণী এখন পড়ছেন নানা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁদেরই একজন মাহমুদুর রহমান ওরফে নিশান। তিনি প্রথম আলোকে জানান, ধানের শিষ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে তিনি থানার হাট উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি দিয়েছেন। এরপর এইচএসসি শেষ করে এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ছেন। তাঁর ভাষ্য, অন্য এলাকায় নিয়মিত নানা ঝামেলা লেগে থাকলেও এই গ্রামের মানুষ শান্তিপ্রিয়, এখানে সবার সহাবস্থান রয়েছে।
গ্রামের মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৯১ সালে স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষানুরাগীর উদ্যোগে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার আগে এই গ্রামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই ছিল না। বলা যায়, গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়াতে বিদ্যালয়টিই মূল ভূমিকা রাখছে। এখন অবশ্য কয়েকটি মাদ্রাসাও গড়ে উঠেছে। তিনি জানান, বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ২৩০ জন।
নতুন শঙ্কা মাদক
ধানের শিষ গ্রামের মানুষ বরাবরই শান্তিপ্রিয় বলে মন্তব্য করেন স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. শেখ রিপন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে মাদক। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, গ্রামে অপরাধ নেই; কিন্তু কিছু লোক সম্প্রতি রাজনীতির খোলস পরে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। এ নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গ্রামের পরিবেশ ঠিক রাখতে মাদক ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
সূত্র: প্রথম আলো — https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/23tvi4hvpu
বিষয়:: নোয়াখালী · গ্রাম · মেঘনা
https://news.rayenda.com/bn/countrywide/wd8pfx