অর্থনীতি

৬২ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত, বেড়েছে লোডশেডিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ আগস্ট ২০২৬, ১:১৬ রাত
৬২ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত, বেড়েছে লোডশেডিং
ছবি: প্রথম আলো

চলমান গ্যাস-সংকটের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহস্বল্পতাও। এর ওপর হঠাৎ কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে। সব সময়ই কিছু কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণে থাকে, এখনো আছে। সব মিলিয়ে কমে গেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এদিকে গরমে চাহিদা বাড়তে থাকায় বেড়েছে লোডশেডিং, বাড়ছে মানুষের ভোগান্তি।

দেশে এখন মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৭টি। এর মধ্যে ৬৪টি সরকারি, ৭০টি বেসরকারি আর ৩টি ভারত ও চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, গতকাল বৃহস্পতিবার ব্যাহত হয়েছে ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্রে উৎপাদন ছিল পুরোপুরি বন্ধ, বাকিগুলো চলেছে সীমিত সক্ষমতায়। ফলে গতকাল দিনের বেলাতেই সর্বোচ্চ লোডশেডিং দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে।

এক মাস ধরে চলছে লোডশেডিং

এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে চলছে গ্যাসের তীব্র সংকট। প্রায় এক মাস ধরে চলছে লোডশেডিংও। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি নামলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমে, গরম পড়লে বেড়ে যায়। শুরুতে লোডশেডিংয়ের পুরো চাপটাই ছিল ঢাকার বাইরে। তবে ১২ আগস্ট রাত থেকে সরকারি নির্দেশনায় ঢাকাতেও লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতিদিন ঢাকার কোনো একটি এলাকায় একবার এক ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের কথা থাকলেও সেটি মানা হচ্ছে না।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জালোওয়াশান আখতার খান বলেন, প্রতিদিন একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। গতকালও সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দুবার বিদ্যুৎ গেছে। এর মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে জেনারেটর। লিফটে আটকে পড়ার ভয় কাজ করে সারাক্ষণ। বাসায় গ্যাসও থাকে না, তাই বাড়তি খরচ করে কিনতে হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার।

ঢাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ করে ডিপিডিসি ও ডেসকো। দুই কোম্পানির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানাচ্ছেন, রাত ১১টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৫০ মেগাওয়াট, সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২০০ মেগাওয়াট এবং দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিকেল ৪টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কোনো লোডশেডিং করা হবে না। কোনো এলাকায় একবারের বেশিও লোডশেডিং হবে না—অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার একজন গ্রাহকের ভাগে পড়বে মাত্র ১ ঘণ্টা। তবে সরবরাহ পরিস্থিতি বুঝে কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটাতে হচ্ছে।

দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ। আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও পুরো সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসের সরবরাহ বাড়ছে না।
— মো. জহুরুল ইসলাম, সদস্য (উৎপাদন), পিডিবি

পিডিবি ও পিজিসিবি সূত্র বলছে, চলতি মাসে এর আগে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ১০ আগস্ট—৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। ৯ আগস্ট থেকে টানা এক সপ্তাহ সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল গড়ে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট। এরপর তা কমে এলেও দুই দিন ধরে আবার বাড়ছে। জ্বালানি তেল থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ। আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও পুরো সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসের সরবরাহ বাড়ছে না। আবার চাইলেও তেলচালিত কেন্দ্র থেকে সব সময় উৎপাদন করা যায় না, মাঝেমধ্যে বিরতির কারণে অর্ধেক সক্ষমতা ব্যবহার করা যায়। এতে করে বিদ্যুৎ ঘাটতি কিছুটা বেড়েছে।

অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা বসেই ছিল

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। গতকাল সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট, সরবরাহ হয়েছে ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই বসে ছিল।

গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, অথচ ৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনই করা যাচ্ছে না। গ্যাসের সংকটে কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ কমিয়ে শিল্পে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।

জ্বালানি তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ালে খরচ আরও চড়বে। তবু সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এসব কেন্দ্র বেশি হারে চালানোর নির্দেশ এসেছে। রাতে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উৎপাদন হচ্ছে, দিনে তা থাকছে দেড় থেকে দুই হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। জ্বালানি তেল থেকে উৎপাদনক্ষমতা আছে ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। পিজিসিবি সূত্র বলছে, গতকাল ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ছিল জ্বালানি তেলের সরবরাহস্বল্পতা।

কয়লা কেন্দ্রগুলোর হাল

পিডিবির কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, দেশের ৮টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা এখন প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। গতকাল উৎপাদন হয়েছে ৫ হাজার মেগাওয়াটেরও কম। কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ আছে পটুয়াখালীর পায়রা কেন্দ্রের একটি ইউনিট, আর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ মাতারবাড়ীর একটি ইউনিট। বড়পুকুরিয়া কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটেও রয়েছে কারিগরি ত্রুটি।

এর বাইরে ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা দেড় হাজার মেগাওয়াট। কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে কেন্দ্রটি। দিনের বেলায় ৯০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করলেও সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত তারা সরবরাহ দিচ্ছে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত।

গ্রামেই ভোগান্তি বেশি

ঢাকার বাইরে সারা দেশের গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮০টি সমিতি। আরইবির পাশাপাশি কিছু এলাকায় সরবরাহ করে পিডিবিও। আরইবি সূত্র বলছে, সরবরাহ ঘাটতির কারণে একই এলাকায় একাধিকবার করে লোডশেডিং করতে হচ্ছে তাদের। গত বুধবার রাত ১২টায় সারা দেশে মোট লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮২৮ মেগাওয়াট; এর মধ্যে শুধু আরইবির এলাকাতেই হয়েছে ২ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম প্রথম আলোকে বলেন, ২০২০-২০২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। এরপর বকেয়া বাড়তে থাকলে উৎপাদন কমানো হয়, বাড়তে থাকে লোডশেডিং। তাঁর মতে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে বকেয়াসহ পিডিবির যেসব বিরোধ আছে সেগুলোর নিষ্পত্তি হলে এখনো তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

যাত্রাবাড়ীর বিবির বাগিচার বাসিন্দা শর্মিলা শর্মি প্রথম আলোকে বলেন, বুধবার ছুটির দিনে বিকেলে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। এরপর রাত ১০টায় গিয়ে বিদ্যুৎ আসে সাড়ে ১১টায়। গতকাল সকাল ১০টা ১০ মিনিটে গিয়ে ফিরেছে এক ঘণ্টা পর। বেশির ভাগ সময় গ্যাসও থাকে না, তাই ব্যবহার করতে হয় বিদ্যুৎচালিত চুলা। খরচ বেড়েছে, অথচ ভোগান্তি কমেনি।

গ্যাসের হিসাব

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমছে নিয়মিতই। স্বাভাবিক সময়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়, যার মধ্যে এলএনজি থেকে আসে ১০৫ কোটি ঘনফুট। গতকাল এলএনজি থেকে সরবরাহ হয়েছে ৭৪ কোটি ঘনফুটেরও কম, ফলে মোট সরবরাহ দাঁড়ায় ২৩৫ কোটি ঘনফুটে। গ্যাস-সংকটে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বেড়েছে রান্না ও পরিবহনে গ্যাসের ভোগান্তি।

আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে আছে দুটি ভাসমান টার্মিনাল। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়, তাতেই গ্যাসের সরবরাহ কমে গিয়ে সংকট বেড়ে যায়। এরপর ১৫ আগস্ট টার্মিনালটি আবার গ্যাস সরবরাহের উপযোগী হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে এলএনজির কার্গো না আসায় সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। গ্যাস সরবরাহ বাড়তে আরও কয়েক দিন লেগে যেতে পারে।

সংকটের মধ্যে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, অযোগ্য জাহাজে এলএনজি আমদানি, চীনের অনভিজ্ঞ কোম্পানির সঙ্গে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ—এসবের মধ্যে সংকট উত্তরণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
— এম শামসুল আলম, জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, সংকটের মধ্যে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, অযোগ্য জাহাজে এলএনজি আমদানি, চীনের অনভিজ্ঞ কোম্পানির সঙ্গে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ—এসবের মধ্যে সংকট উত্তরণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কাঠামোগত সংস্কার দরকার। না হলে অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা, চুরি বন্ধ হবে না; সংকটও কাটবে না।

সূত্র: প্রথম আলো

৩ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

হিরোর ১০ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রির মাইলফলক, এবার নজর আরও উচ্চমানে: হর্ষবর্ধন চিত্‌লে

হিরোর ১০ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রির মাইলফলক, এবার নজর আরও উচ্চমানে: হর্ষবর্ধন চিত্‌লে