শিশুর সুষ্ঠু বিকাশে বাবার ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অথচ একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, শিশুর যত্ন নেন মাত্র ৭ শতাংশ বাবা। অন্যদিকে জাতীয় জরিপ বলছে, দেশের ৩০ শতাংশ শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ ঘটছে না।
শিশুর বিকাশ নিয়ে এসব তথ্য গতকাল বৃহস্পতিবার তুলে ধরা হয় একটি জাতীয় কর্মশালায়। রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে সমন্বিত প্রারম্ভিক শৈশবকালীন যত্ন ও বিকাশ সেবার মূল্যায়ন’ শীর্ষক এই কর্মশালার যৌথ আয়োজক ছিল জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, ইউনিসেফ ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। অনুষ্ঠানে ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বিভাগ ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা, গবেষক, শিশু একাডেমির প্রতিনিধি, শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, দাতা সংস্থা ও ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
কর্মশালায় বলা হয়, গর্ভধারণের তিন সপ্তাহ পর থেকেই স্থায়ীভাবে শুরু হয়ে যায় শিশুর মস্তিষ্কের গঠন। গর্ভধারণ থেকে এক হাজারতম দিন পর্যন্ত সময়টিকে দেখা হয় সম্ভাবনার জানালা হিসেবে—শিশুর বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় এটাই। এই সময়েই দরকার বিনিয়োগ। আর সেই বিনিয়োগ মানে স্নেহ, মায়া, মমতা, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা।
বাংলাদেশে দুই থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের ১০টির মধ্যে ৩টির বিকাশ ঠিকমতো হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে বৈষম্য আছে।
— মালালা আহমাদজাই, ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ, ইউনিসেফ
একাধিক আলোচক ও আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা শিশুর বিকাশ নিয়ে বেশ কিছু তথ্য তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, তিন বছরের মধ্যেই শিশুর ৮০ শতাংশ বিকাশ সম্পন্ন হয়ে যায়। এই সময়ে শিশুর সঙ্গে ইতিবাচক আচরণ, কথাবার্তা আর খেলাধুলা করলে তার মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে সংযোগ বাড়ে। স্কুলজীবনে বা তার পরের কোনো বয়সে বিনিয়োগের চেয়ে এই সময়ের বিনিয়োগই সবচেয়ে বেশি ফল দেয়। আর শিশুর সুষ্ঠু বিকাশে শুধু মা নন, বাবারও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ও ইউনিসেফের ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ মালালা আহমাদজাই বলেন, বাংলাদেশে দুই থেকে চার বছর বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে ৩ জনেরই বিকাশ ঠিকমতো হচ্ছে না। এখানে বৈষম্যও রয়েছে। সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণির শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৮ শতাংশ, আর সবচেয়ে ধনী শ্রেণির মধ্যে ২০ শতাংশ। অর্থাৎ দুই শ্রেণির শিশুদের বিকাশের ব্যবধান প্রায় ২০ শতাংশ বিন্দু।
যে পাঁচটি সেবার কথা
গবেষকেরা বলছেন, তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রারম্ভিক শৈশবকালীন যত্ন ও বিকাশের ক্ষেত্রে ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংক পাঁচ ধরনের সেবার কথা বলেছে—সুস্বাস্থ্য, পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী যত্ন এবং প্রারম্ভিক শিখনের সুযোগ। এর মধ্যে প্রথম তিনটি নানা কর্মসূচির মাধ্যমে এই বয়সী শিশুরা পেয়ে থাকে। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী যত্ন আর প্রারম্ভিক শিখনের সুযোগ কোনো কর্মসূচিতেই নেই।
দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সেবাগুলো দেওয়া সম্ভব কি না, দিলে তা কতটা কাজে আসে—সেটি যাচাই করাই ছিল এই গবেষণার উদ্দেশ্য। শুরুতে ৮৯০ শিশু এবং শেষ পর্যায়ে ১ হাজার ১৯ শিশুর তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করেন গবেষকেরা।
গবেষণার প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব তুলে ধরেন ইউনিসেফের পুষ্টিবিশেষজ্ঞ আঞ্জুমান তাহমিনা ফেরদৌস। তিনি জানান, গবেষণাটি চালানো হয়েছে ভোলার বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখান এবং সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ ও শ্যামনগর উপজেলায়। এ জন্য উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকের চিকিৎসক এবং মাঠকর্মীদের মধ্যে ৫৬৫ জনকে দেওয়া হয় প্রশিক্ষণ। ১৫৪টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পাঠানো হয় খেলার সামগ্রী—ছবির বই, খেলনা ও কার্ড। চারটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং বাছাই করা কিছু প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তৈরি করা হয় খেলার কর্নার। ২০২৩ সালের মার্চে শুরু হওয়া গবেষণাটি শেষ হয় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।