স্বাস্থ্য

শিশুর যত্ন সবচেয়ে কম নেন বাবারা

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ আগস্ট ২০২৬, ৮:১৪ সকাল
শিশুর যত্ন সবচেয়ে কম নেন বাবারা
ছবি: প্রথম আলো

শিশুর সুষ্ঠু বিকাশে বাবার ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অথচ একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, শিশুর যত্ন নেন মাত্র ৭ শতাংশ বাবা। অন্যদিকে জাতীয় জরিপ বলছে, দেশের ৩০ শতাংশ শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ ঘটছে না।

শিশুর বিকাশ নিয়ে এসব তথ্য গতকাল বৃহস্পতিবার তুলে ধরা হয় একটি জাতীয় কর্মশালায়। রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে সমন্বিত প্রারম্ভিক শৈশবকালীন যত্ন ও বিকাশ সেবার মূল্যায়ন’ শীর্ষক এই কর্মশালার যৌথ আয়োজক ছিল জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, ইউনিসেফ ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। অনুষ্ঠানে ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বিভাগ ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা, গবেষক, শিশু একাডেমির প্রতিনিধি, শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, দাতা সংস্থা ও ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

কর্মশালায় বলা হয়, গর্ভধারণের তিন সপ্তাহ পর থেকেই স্থায়ীভাবে শুরু হয়ে যায় শিশুর মস্তিষ্কের গঠন। গর্ভধারণ থেকে এক হাজারতম দিন পর্যন্ত সময়টিকে দেখা হয় সম্ভাবনার জানালা হিসেবে—শিশুর বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় এটাই। এই সময়েই দরকার বিনিয়োগ। আর সেই বিনিয়োগ মানে স্নেহ, মায়া, মমতা, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা।

বাংলাদেশে দুই থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের ১০টির মধ্যে ৩টির বিকাশ ঠিকমতো হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে বৈষম্য আছে।
— মালালা আহমাদজাই, ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ, ইউনিসেফ

একাধিক আলোচক ও আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা শিশুর বিকাশ নিয়ে বেশ কিছু তথ্য তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, তিন বছরের মধ্যেই শিশুর ৮০ শতাংশ বিকাশ সম্পন্ন হয়ে যায়। এই সময়ে শিশুর সঙ্গে ইতিবাচক আচরণ, কথাবার্তা আর খেলাধুলা করলে তার মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে সংযোগ বাড়ে। স্কুলজীবনে বা তার পরের কোনো বয়সে বিনিয়োগের চেয়ে এই সময়ের বিনিয়োগই সবচেয়ে বেশি ফল দেয়। আর শিশুর সুষ্ঠু বিকাশে শুধু মা নন, বাবারও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ও ইউনিসেফের ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ মালালা আহমাদজাই বলেন, বাংলাদেশে দুই থেকে চার বছর বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে ৩ জনেরই বিকাশ ঠিকমতো হচ্ছে না। এখানে বৈষম্যও রয়েছে। সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণির শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৮ শতাংশ, আর সবচেয়ে ধনী শ্রেণির মধ্যে ২০ শতাংশ। অর্থাৎ দুই শ্রেণির শিশুদের বিকাশের ব্যবধান প্রায় ২০ শতাংশ বিন্দু।

যে পাঁচটি সেবার কথা

গবেষকেরা বলছেন, তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রারম্ভিক শৈশবকালীন যত্ন ও বিকাশের ক্ষেত্রে ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংক পাঁচ ধরনের সেবার কথা বলেছে—সুস্বাস্থ্য, পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী যত্ন এবং প্রারম্ভিক শিখনের সুযোগ। এর মধ্যে প্রথম তিনটি নানা কর্মসূচির মাধ্যমে এই বয়সী শিশুরা পেয়ে থাকে। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী যত্ন আর প্রারম্ভিক শিখনের সুযোগ কোনো কর্মসূচিতেই নেই।

দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সেবাগুলো দেওয়া সম্ভব কি না, দিলে তা কতটা কাজে আসে—সেটি যাচাই করাই ছিল এই গবেষণার উদ্দেশ্য। শুরুতে ৮৯০ শিশু এবং শেষ পর্যায়ে ১ হাজার ১৯ শিশুর তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করেন গবেষকেরা।

গবেষণার প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব তুলে ধরেন ইউনিসেফের পুষ্টিবিশেষজ্ঞ আঞ্জুমান তাহমিনা ফেরদৌস। তিনি জানান, গবেষণাটি চালানো হয়েছে ভোলার বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখান এবং সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ ও শ্যামনগর উপজেলায়। এ জন্য উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকের চিকিৎসক এবং মাঠকর্মীদের মধ্যে ৫৬৫ জনকে দেওয়া হয় প্রশিক্ষণ। ১৫৪টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পাঠানো হয় খেলার সামগ্রী—ছবির বই, খেলনা ও কার্ড। চারটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং বাছাই করা কিছু প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তৈরি করা হয় খেলার কর্নার। ২০২৩ সালের মার্চে শুরু হওয়া গবেষণাটি শেষ হয় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

মায়ের পর দাদি-নানি

গবেষণার ফল উপস্থাপন করতে গিয়ে আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী শেখ জামাল হোসেন জানান, মায়ের পর এই বয়সী শিশুদের সবচেয়ে বেশি সেবা দেন দাদি-নানিরা—৫৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ শিশু যত্ন পায় তাঁদের কাছ থেকে। ভাইবোনের কাছ থেকে যত্ন পায় ১৬ দশমিক ০৫ শতাংশ শিশু, চাচির কাছ থেকে ১০ দশমিক ২১ শতাংশ, অন্যদের কাছ থেকে ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। আর বাবাদের কাছ থেকে যত্ন পায় মাত্র ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ শিশু। এই উত্তরগুলো গবেষকেরা পেয়েছেন শিশুদের মায়েদের কাছ থেকেই। শেখ জামাল হোসেন বলেন, ‘শিশুকে আদর–যত্ন বা সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাবাদের অবস্থান দেখে আমরা কিছুটা বিস্মিত হয়েছি।’

গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের কোনো একটা সময় শিশুর আশপাশে কেউ থাকেন না। শিশু অরক্ষিত অবস্থায় থাকে। এটি পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর একটি কারণ বলে গবেষকেরা মনে করেন।

গবেষণায় আরেকটি বিষয়ও ধরা পড়েছে—দিনের কোনো না কোনো সময়ে শিশুর আশপাশে কেউই থাকেন না, শিশু থাকে অরক্ষিত। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর পেছনে এটিও একটি কারণ বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

শেখ জামাল হোসেন জানান, গবেষণার শুরু ও শেষের বিভিন্ন সূচক মিলিয়ে দেখা গেছে, শিশুদের সার্বিক বিকাশে অগ্রগতি হয়েছে। নানা মাপকাঠি ব্যবহার করে গবেষকেরা দেখেছেন, বুদ্ধি, ভাষা, আবেগ ও পেশি সঞ্চালন—সব ক্ষেত্রেই উন্নতি এসেছে।

অপুষ্টি ও ভারী ধাতুর প্রভাব

গবেষণার ফল উপস্থাপনের পর অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ও আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, মিরপুরে সংস্থাটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, অপুষ্টি শৈশবকালীন বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তিনি জানান, ক্যাডমিয়াম, সিসা, মার্কারি ও আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতুও শিশুর বিকাশের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিন দশক ধরে শিশু বিকাশ নিয়ে কাজ করছেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী জেনা হামাদানি। প্যানেল আলোচনায় তিনি বলেন, এই বয়সী শিশুদের সেবা দেওয়ার মতো ব্যবস্থা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে নেই। একমাত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ভেতর দিয়েই এই সেবা দেওয়া সম্ভব, কারণ সারা দেশে এর অবকাঠামো ও জনবল দুটোই রয়েছে। ভোলা ও সাতক্ষীরার গবেষণাতেও দেখা গেছে, কাজটি সম্ভব।

অনুষ্ঠানে কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, দারিদ্র্য ও অপুষ্টি থাকলে প্রারম্ভিক শৈশবকালীন যত্ন ও সেবা আদৌ কতটা কাজে দেবে। জবাবে জেনা হামাদানি বলেন, অপুষ্টির শিকার শিশুও এই সেবা থেকে উপকৃত হয়। গবেষণার উদ্ধৃতি টেনে তিনি জানান, ৩০ বছর আগে এই সেবা পাওয়া শিশুরা এখন বড় হয়েছে। দেখা গেছে, তারা স্কুলে ভালো করেছে, তাদের ঝরে পড়ার হার কম, অপরাধপ্রবণতাও কম—আর সবকিছু ছাপিয়ে তাদের উপার্জনও ভালো।

প্রারম্ভিক শৈশবকালীন যত্ন ও সেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার নিয়মিত কাজের অংশে পরিণত করতে হবে। তবে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তাও জরুরি।
— মোহাম্মদ ইউনুস আলী, পরিচালক, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান

অনুষ্ঠানের সভাপতি ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, প্রারম্ভিক শৈশবকালীন যত্ন ও সেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার নিয়মিত কাজের অংশ বানাতে হবে। তবে এ জন্য অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তাও দরকার।

অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে আরও বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ব স্বাস্থ্য অনুবিভাগ) শেখ মোমেনা মনি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমির প্রকল্প পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম চৌধুরী, ইসিডি নেটওয়ার্কের ভাইস চেয়ার মাহমুদা আক্তার, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালক রওশন জাহান আখতার এবং একই প্রতিষ্ঠানের পুষ্টিবিদ জয়াশীষ রায়।

সূত্র: প্রথম আলো

৬ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

দুই মাসেই এডিসের ঘনত্ব দ্বিগুণ, রাজশাহীতে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি

দুই মাসেই এডিসের ঘনত্ব দ্বিগুণ, রাজশাহীতে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি