আন্তর্জাতিক

নেপাল-চীন সীমান্তে নতুন হ্রদের পানি উপচে পড়ছে, আতঙ্কে পাহাড়ে আশ্রয় নিচ্ছেন মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ আগস্ট ২০২৬, ৫:৫৩ ভোর
নেপাল-চীন সীমান্তে নতুন হ্রদের পানি উপচে পড়ছে, আতঙ্কে পাহাড়ে আশ্রয় নিচ্ছেন মানুষ
ছবি: প্রথম আলো
  • বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আগে হ্রদের পানি ২৫ লাখ ঘনমিটারে পৌঁছায় বলে জানিয়েছে নেপাল।
  • নেপাল ৯০ মিনিটের জন্য উদ্ধার অভিযান বন্ধ রেখেছিল বলে জানান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা।
  • বুধবারের বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৫০০-র কাছাকাছি পৌঁছেছে, নিখোঁজ প্রায় ১ হাজার।
  • বিদেশ থেকে আসা অনুসন্ধান ও উদ্ধার প্রস্তাবের প্রয়োজন নেই বলে নাকচ করেছে নেপাল।

নেপাল-চীন সীমান্তে হিমবাহ ধসে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ থেকে আজ শুক্রবার পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে। এতে গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র আতঙ্ক। দুই দিন আগের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় তছনছ হয়ে যাওয়া এলাকাগুলো আবার পড়েছে বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে। এ কারণে কিছু সময়ের জন্য উদ্ধারকাজও বন্ধ রাখতে হয়েছে।

গত বুধবারের সেই প্রলয়ংকরী বন্যায় নেপালে প্রাণ গেছে ৪৮৯ জনের, চীনের তিব্বতে ৫ জনের। দুই দেশ মিলিয়ে এখনো নিখোঁজ এক হাজারের বেশি মানুষ।

হিমবাহ ভেঙে পড়ার পর বিশাল শিলাখণ্ড, বরফ, কাদা আর ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত হিমালয়ের পার্বত্য নদীব্যবস্থা ধরে নিচে নেমে এসেছিল। সেই সময়েই তৈরি হয় একটি হ্রদ, যেখানে ক্রমাগত পানি জমতে থেকে বাড়তে থাকে পানির স্তর।

নেপালের কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার হ্রদের পানি উপচে ভোটেকোশি নদীতে পড়ার আগে জলাধারে পানির পরিমাণ ছাড়িয়ে যায় ২৫ লাখ ঘনমিটার। আগের দিন যা ছিল আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার।

বন্যাদুর্গত রসুয়া জেলার শীর্ষ কর্মকর্তা নরেন্দ্র পরিয়ার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা একটি নোটিশ পেয়েছি, হ্রদের তীর ভেঙে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু এটি ঠিক কত বড় এবং পানির স্তর কতটা উঁচু, তা আমাদের জানা নেই। তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, নদীতে পানির স্তর বাড়ছে।’

রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মাইকে নদী থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তা দেওয়া শুরু হতেই মানুষ জিনিসপত্র নিয়ে উঁচু জায়গার দিকে ছুটতে শুরু করেন। আর রশি ও স্ট্রেচার হাতে সারিবদ্ধ হয়ে প্রস্তুত দাঁড়িয়ে থাকেন পুলিশ সদস্যরা।

৪০ বছর বয়সী শান্তি তামাং রয়টার্সকে বলেন, ‘সবাইকে “পালাও” বলে সতর্ক করা শুরু হলে আমিও দৌড় দিলাম। বিদুর শহরের সাইরেনও বেজে উঠেছিল। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।’ উদ্ধারকর্মীদেরও তাঁদের সরঞ্জাম নিয়ে নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে বলা হয়েছিল।

নিখোঁজদের খুঁজতে চীনা প্রেসিডেন্টের নির্দেশ

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি শুক্রবার জানায়, হ্রদটির বাঁধ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি দেখা দেওয়ায় দেশটির সব উদ্ধারকর্মী ও যানবাহনকে পিছিয়ে নিরাপদ এলাকায় অবস্থান নিতে বলা হয়। পরে অবশ্য ‘উজানের নদীর মাধ্যমে হ্রদের ঝুঁকিটি সামলানো সম্ভব বলে মনে হওয়ায়’ উদ্ধারকাজ আবার শুরু হয়।

নেপালের সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, নেপাল কর্তৃপক্ষ ৯০ মিনিটের জন্য উদ্ধার অভিযান স্থগিত রেখেছিল, পরে তা ফের চালু করা হয়। বুধবারের বন্যা গ্রাম ও উপত্যকাগুলোকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, ধ্বংস করেছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাস্তাঘাট ও সেতু। কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসাকে যুক্ত করা এবং তীর্থযাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় সড়কটিও ধ্বংস হয়ে গেছে। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৮০০ জন বিদেশি নাগরিক, যাঁদের অনেকেই ভারতের হিন্দু তীর্থযাত্রী—তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তাঁরা।

উদ্ধারকাজের কৌশল ঠিক করতে শুক্রবার বেইজিংয়ে বৈঠক করেছে চীনের পলিটব্যুরো। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সভাপতিত্বে হওয়া ওই সভায় বলা হয়, কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই ‘বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে এবং চীন ও বিদেশের নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে।’

বৈঠকে বলা হয়, উদ্ধারকাজ পড়েছে ‘অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জের’ মুখে। একই সঙ্গে হিমবাহ হ্রদ, পাহাড়ধসের ঝুঁকি ও প্রাকৃতিক বাঁধের ওপর নজরদারি জোরদার করা, নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি সহায়তা পাঠানো এবং আন্তর্জাতিক দুর্যোগ সহযোগিতা আরও মজবুত করার আহ্বান জানানো হয়।

এর আগে নেপালের উদ্ধারকারী দলগুলো হেলিকপ্টার নিয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষের খোঁজে অনুসন্ধান চালায়। বিভিন্ন শহর ও উপত্যকায় আটকে পড়া হাজার হাজার মানুষের জন্য আকাশপথে পাঠানো হয় জরুরি ত্রাণ। অন্যদিকে জরুরি পরিষেবা দলগুলো সমতলে ভেসে আসা বহু মরদেহ উদ্ধার করেছে। অনুসন্ধানে ব্যবহার করা হচ্ছে কুকুরও।

রসুয়া থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার উদ্ধার হওয়া শেষ ব্যক্তিদের একজন দিবগা তামাং। আরও তিনজনের সঙ্গে তাঁকে এয়ারলিফট করে নেওয়া হয় নুয়াকোটের একটি সেনাক্যাম্পে।

তামাং বলেন, ‘আমাদের সব মানুষ চলে গেছে। সবাই মারা গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার মতো আর কেউ বেঁচে নেই। সবকিছু ও সবাই শেষ হয়ে গেছে। সব শেষ।’

বিদেশি সহায়তা নাকচ নেপালের

চারদিক থেকে সাহায্যের প্রস্তাব এলেও নেপাল জানিয়ে দিয়েছে, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে অন্য কোনো দেশের সহায়তা তাদের দরকার নেই।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী শুক্রবার বলেন, ‘সাহায্যের প্রস্তাব আসাটাই স্বাভাবিক, তবে আমাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। আপাতত আমাদের এই ধরনের সাহায্যের প্রয়োজন নেই।’

সিউলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি র‍্যাপিড রেসপন্স টিম ইতিমধ্যে কাঠমান্ডুতে পৌঁছেছে। কিন্তু নেপাল সরকার বিদেশি উদ্ধারকারীদের সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা না করায় তাদের মোতায়েন করা হয়নি।

‘কাঠমান্ডু পোস্ট’ জানিয়েছে, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ নিজেদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলকে অভিযানে যুক্ত হওয়ার অনুমতি দিতে অনুরোধ জানিয়েছিল সরকারকে।

চীন সীমান্তের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা গিরোং সীমান্ত ক্রসিংয়ে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত চীনা উদ্ধারকারীরা পৌঁছাতে পারেননি বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলেছে। কারণ, কর্মীরা তখনো ওই এলাকার প্রধান সংযোগ সড়ক থেকে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজে ব্যস্ত।

বুধবারের এক ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, কাদামাটি মেশানো পানির বিশাল স্রোত আর ধ্বংসাবশেষ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সীমান্ত ক্রসিং এলাকার একের পর এক অবকাঠামো চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছে, ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকা মানুষকে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি গতকাল জানিয়েছে, তিব্বতের গিরোং কাউন্টিতে নিখোঁজের সংখ্যা ৫৫৮, যাঁদের মধ্যে ২৬০ জনই বিদেশি নাগরিক। চীনের অংশে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে মাত্র পাঁচজনের মৃত্যু।

সিনহুয়া জানিয়েছে, চীনের দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং গতকাল বিকেলে পৌঁছেছেন গিরোংয়ের দুর্যোগকবলিত এলাকায়। চীন এই দুর্যোগকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তাঁর এই সফরই তার প্রমাণ।

ভবনগুলো ‘টুথপিকের মতো নিশ্চিহ্ন’

বিশ্বজুড়ে নিখোঁজদের স্বজনেরা প্রিয়জনদের খোঁজ পেতে ব্যাকুল হয়ে আছেন।

স্নেহা সুধীর সেই ১০ নারীর একজন, যাঁদের স্বামীরা নেপাল থেকে তিব্বতের কৈলাস পর্বতের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন—ঠিক তখনই দুর্যোগের কবলে পড়ে অঞ্চলটি। তাঁরা থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ভার্জিনিয়ায়।

ভার্জিনিয়ার চ্যান্টিলিতে নিজের বাড়িতে বসে অশ্রুসজল চোখে গতকাল স্নেহা সুধীর বলেন, ‘তারা কোথায়?’

তিনি জানান, নারীরা একে অপরকে মানসিকভাবে সাহস জোগাচ্ছেন। খবরের আশায় যোগাযোগ রাখছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ এবং বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সঙ্গে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নেপালকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘কেউ কখনো এমন দৃশ্য দেখেনি, যেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী, মজবুত এবং ভালোভাবে তৈরি ভবনগুলো টুথপিকের (দাঁত খোঁচানোর কাঠি) মতো মুছে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এটি একটি ভয়াবহ ঘটনা। আমরা সাহায্য পাঠাচ্ছি এবং আমরা সেখানকার নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা তাদের জানিয়েছি, তারা যা চাইবে, তাই পাবে।’

সূত্র: প্রথম আলো

২ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকছে ট্রাম্পের মিত্র কোম্পানিগুলো

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকছে ট্রাম্পের মিত্র কোম্পানিগুলো