আন্তর্জাতিক

১১ বছর পর নেপালে বড় দুর্যোগ, নতুন করে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ আগস্ট ২০২৬, ২:৪১ রাত
১১ বছর পর নেপালে বড় দুর্যোগ, নতুন করে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা
ছবি: প্রথম আলো

নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে বুধবারের সকালটা শুরু হয়েছিল আর দশটা দিনের মতোই। রাতে বৃষ্টি হয়নি একফোঁটাও। সকালের আকাশ ছিল ঝকঝকে, রোদে ভরা। স্থানীয় বাসিন্দারা বেরিয়ে পড়েছিলেন রোজকার কাজে—কেউ বাজারে, কেউ কর্মস্থলে, কেউ বা সীমান্ত-পথের দিকে। কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসাকে যুক্ত করা সড়কে পর্যটক আর তীর্থযাত্রীদের চলাচলও ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু সকাল গড়াতেই তিব্বতের দিক থেকে হঠাৎ বিপুল ঢলের সঙ্গে নেমে আসে বরফ, পাথর আর কাদার স্রোত। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বদলে যায় চিরচেনা দৃশ্যপট। ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্প—সব ভাসিয়ে নিয়ে যায় সেই প্রবল ঢল।

এই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নেপালে উদ্ধার করা হয়েছে ৩৮৯ জনের মরদেহ। নিখোঁজ প্রায় দেড় হাজার মানুষ, যাঁদের মধ্যে প্রায় ৭০০ জনই বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতের নাগরিক।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, বন্যা-ভূমিধসের পর নেপালে এ পর্যন্ত ৭৯৬ জনকে উদ্ধার করা গেছে। উদ্ধারকাজে যুক্ত রয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী। বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ উদ্ধার অভিযানে সহায়তার আগ্রহ দেখালেও নেপাল জানিয়ে দিয়েছে, পরিস্থিতি সামলানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

এদিকে চীনের তিব্বতেও নিখোঁজ ৫৫৮ জন। তিব্বত ও নেপালের যে জায়গায় হিমবাহ ও পাথরধস হয়েছে, সেখানে আগামী ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবার বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নেপালে গত ১১ বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় দুর্যোগ। এর আগে ২০১৫ সালের এপ্রিলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে দেশটিতে প্রাণ গিয়েছিল প্রায় ৯ হাজার মানুষের।

ভূমিকম্প নাকি ধস

নেপালের কর্মকর্তারা প্রথমে জানিয়েছিলেন, ভূমিকম্পের কারণেই হয়তো হিমবাহের বরফ ও পাথর ধসে পড়ে বন্যা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) ব্যাখ্যা ভিন্ন—হিমবাহের বরফ ও পাথর ধসে পড়ার সময় যে কম্পন তৈরি হয়েছিল, সেটিই প্রথমে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে রেকর্ড হয়ে থাকতে পারে। ধসে পড়া বরফ, পাথর ও মাটি নদীর পানির সঙ্গে মিশে তৈরি করে প্রবল ঢল, যা শেষ পর্যন্ত হাজির হয় ভয়াবহ বন্যা হয়ে।

মিনিটে মিনিটে যা ঘটেছিল

কাঠমান্ডু পোস্ট–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের সেন্টার অব হাইড্রোলজি অ্যান্ড ওয়াটার রিসোর্সেস রিসার্চের ফ্লাড ফোরকাস্টিং ডিভিশনের কারিগরি প্রতিবেদনে বুধবারের বন্যার গতিপথ ও সময়সূচির একটি প্রাথমিক চিত্র উঠে এসেছে। তাতে বলা হয়, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে রেকর্ড হয় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি কম্পন। এর ২৮ মিনিট পর, সকাল ৯টা ৫ মিনিটে কর্তৃপক্ষ খবর পায়—তিব্বতের দিক থেকে প্রবল ঢল ঢুকে পড়েছে ভোতেকোশি নদীতে। সেখান থেকে ঢলটি ভোতেকোশি হয়ে নামে ত্রিশূলী নদীতে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ভাটির দিকে।

ঢলের খবর পাওয়ামাত্রই নদীতীরের জনপদগুলোতে পাঠানো শুরু হয় সতর্কবার্তা। সকাল ৯টা ১৫ থেকে ৯টা ১৬ মিনিটের মধ্যে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ান জেলার নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের কাছে পাঠানো হয় ছয় লাখের বেশি এসএমএস।

বেলা ১১টা ২৬ মিনিটে মালেখুর ফুরকে পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে নদীর পানি বিপৎসীমা পেরিয়ে যায়। মাত্র ১৭ মিনিটের মাথায়, বেলা ১১টা ৪৩ মিনিটে বন্যার পানিতে ভেসে যায় ফুরকে সেতু ও আশপাশের স্থাপনা। বেলা একটার দিকে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হয়, ঢল মুগলিন এলাকা পেরিয়ে গেছে। এরপর দেবঘাট পর্যন্ত ত্রিশূলী নদীর তীরের বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে বলা হয়।

বেলা ৩টা ২০ মিনিটের দিকে ঢল পৌঁছায় নারায়ণী-দেবঘাট এলাকায়। ঘণ্টাখানেক পর, বিকেল চারটায় দেবঘাটে নদীর পানির উচ্চতা ওঠে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৫৭ মিটারে। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে সেখানে পানি নামতে শুরু করে।

প্রাথমিক হিসাবে, বন্যার সঙ্গে নেমে এসেছে প্রায় দুই কোটি ঘনমিটার বাড়তি পানি। অর্থাৎ তিব্বতের দিক থেকে ভোতেকোশিতে ঢোকার পর ঢলটি প্রায় ১০ ঘণ্টায় ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী পেরিয়ে দেবঘাটে গিয়ে পৌঁছায়।

লাংটাং লিরুং থেকে নামল ধস

রয়টার্স ও কাঠমান্ডু পোস্ট জানায়, দুর্যোগের কারণ নিয়ে বিশ্লেষণ এখনো চলছে। তবে স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢাল থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধস নেমে পড়েছিল লহেন্দেখোলা নদীতে। এতে নদীটির প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে গিয়ে তৈরি হয় একটি প্রাকৃতিক বাঁধ। পরে সেই বাঁধ ভেঙে পানি, বরফ, পাথর ও কাদার স্রোত প্রবল বেগে নেমে আসে ভাটির দিকে।

৭ হাজার ২৪৫ মিটার উঁচু লাংটাং লিরুং পর্বতটি পুরোপুরি নেপালের ভেতরেই। সেখান থেকে নেমে আসা ধ্বংসাবশেষ আটকে দেয় লহেন্দে নদীর প্রবাহ। বর্ষার পানিতে সেখানে সাময়িক একটি হ্রদ তৈরি হওয়ার পর তা ভেঙে প্রবল স্রোত ভোতেকোশির দিকে ধেয়ে আসে।

নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটিও বরফ ও পাথরের ধসকেই বন্যার প্রধান সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে রাসুয়াগাধি সীমান্ত ক্রসিংয়ের প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে বড় ধসের চিহ্নও মিলেছে।

চীনের সরকারি ভূতত্ত্ববিদ গুও ঝাওচেং বলেন, উঁচু পার্বত্য এলাকায় বরফের ধস থেকেই তৈরি হয়েছে ধ্বংসাবশেষের এই প্রবাহ। পথে পাথর আর কাদা সঙ্গে নিয়ে সেটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। স্রোতটি ছুটেছে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫০ মিটার বেগে, চীনের অংশেই ছড়িয়ে পড়েছে ২০ কিলোমিটারের বেশি এলাকায়। সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছে যে মানুষ নিজেদের বাঁচানোর সময়টুকুও পাননি।

নেপাল রেডক্রস জানিয়েছে, কয়েকটি গ্রাম পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সড়ক ও সেতু ভেঙে পড়ায় অনেক এলাকার সঙ্গে যোগাযোগই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ছায়া

বন্যার তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করতে সতর্ক থাকছেন বিজ্ঞানীরা। তবে এর পেছনে উষ্ণতা বৃদ্ধির ভূমিকা থাকতে পারে বলেই মনে করছেন তাঁরা। নিউজিল্যান্ডের আর্থ সায়েন্সেসের বিজ্ঞানী সাইমন কক্স বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উঁচু পর্বতে বরফ ও পাথর অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়লে বরফ গলার পানি বাড়ে, বদলে যায় বরফ জমা-গলা আর বৃষ্টির ধরন। এতে কোনো কোনো এলাকায় পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে বড় ধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তসরকারি সংস্থা আইসিআইএমওডির বিশেষজ্ঞ ফারুক আজমের মতে, ভারী তুষার গলা আর ভূকম্পন—এই দুইয়ের মিলিত প্রভাবেও শুরু হতে পারে বরফ ও পাথরের ধস।

জাতিসংঘের ২০২৩ সালের তথ্য বলছে, ৩০ বছরের সামান্য বেশি সময়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে নেপালের তুষারাবৃত পাহাড়ের মোট বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই গলে গেছে। আগের দশকের তুলনায় সর্বশেষ দশকে দেশটির হিমবাহ গলার হার বেড়েছে ৬৫ শতাংশ।

নতুন হ্রদ ঘিরে উদ্বেগ

এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা নতুন করে তৈরি হওয়া একটি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে আটকে থাকা হ্রদ নিয়ে। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গিরং এলাকার উজানে ওই হ্রদে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত জমেছে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি। আগামী তিন দিনে সেখানে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে। এতে প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে গিয়ে নতুন করে বড় বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠতে পারে ১ সেপ্টেম্বরের দিকে।

হাসপাতালে স্বজনদের ভিড়

নেপালে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী নদীতীর আর ভাটির এলাকায় খুঁজে চলেছে নিখোঁজদের। দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টারে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে খাবার, তাঁবু ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী। কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলোতেও নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ভিড় করছেন মানুষ। ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে পুলিশ ডেস্কে টানানো হয়েছে নিখোঁজদের নাম ও ছবি। কোনো অ্যাম্বুলেন্স এলেই স্বজনেরা ছুটে যাচ্ছেন—হয়তো ভেতরে আছেন তাঁদেরই প্রিয়জন।

বন্যায় স্বজন হারানো ৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বারাল রয়টার্সকে বলেন, কাদার বিশাল ঢল ঘরে ঢুকে পড়লে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তীব্র স্রোত স্ত্রীর হাত তাঁর হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। এখনো কাদার নিচে স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়ার আশাতেই আছেন তিনি।

সূত্র: প্রথম আলো

৫ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

বিলীন গ্রামের পর গ্রাম, ভিডিওতে দেখা গেল নেপালের বিপর্যয়

বিলীন গ্রামের পর গ্রাম, ভিডিওতে দেখা গেল নেপালের বিপর্যয়