ধর্ম

নিশাপুর: যে শহরে জন্ম বহু মুসলিম মনীষীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ আগস্ট ২০২৬, ৭:৩৯ সকাল
নিশাপুর: যে শহরে জন্ম বহু মুসলিম মনীষীর
ছবি: প্রথম আলো

মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত শহরগুলোর একটি নিশাপুর। খোরাসান অঞ্চলের এই প্রাচীন জনপদ প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে ইতিহাস, সভ্যতা, জ্ঞান আর সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে টিকে ছিল। আব্বাসীয় আমলে বাণিজ্য ও জনবসতির জন্য শহরটির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

তবে সেই সমৃদ্ধি চিরস্থায়ী হয়নি। ৫৪০ হিজরিতে (১১৪৫ খ্রিষ্টাব্দ) এক ভূমিকম্পে শহরটি ধ্বংসের মুখে পড়ে। এরপর ঘুজ উপজাতির হামলা এবং ৬১৮ হিজরিতে (১২২১ খ্রিষ্টাব্দ) মঙ্গোল আক্রমণে সেই ধ্বংসযজ্ঞ পূর্ণতা পায়।

একটি শহরের পরিচয় কখনো তার প্রাসাদে ধরা পড়ে, কখনো তার বাজারে। নিশাপুরের পরিচয় কিন্তু লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়—মসজিদের দারসবাড়িতে, মুহাদ্দিসদের মজলিশে আর পাণ্ডুলিপিতে ঠাসা গ্রন্থাগারে। কারণ খোরাসানের এই নগর একসময় এমন এক জ্ঞানকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, যেখানে দূরদূরান্ত থেকে শিক্ষার্থী আর আলেমরা এসে জড়ো হতেন।

ইয়াকুত আল-হামাবি নিশাপুরকে বর্ণনা করেছেন খোরাসানের অন্যতম সমৃদ্ধ নগর হিসেবে। তাঁর ভাষ্যে, শহরটি ছিল গুণীজন ও পণ্ডিতদের উৎস। (মু’জামুল বুলদান, ৫/৩৩১–৩৩৩)

কিন্তু নিশাপুরের আসল মহত্ত্ব তার ভূগোলে ছিল না, ছিল সেখানে গড়ে ওঠা জ্ঞান-পরম্পরায়।

যার ইতিহাস লিখেছেন আলেমরা

শহরটির বুদ্ধিবৃত্তিক গুরুত্ব বুঝতে একটি তথ্যই যথেষ্ট—এখানকার আলেমদের জীবন ও জ্ঞানচর্চা নিয়ে আলাদা ইতিহাসগ্রন্থই রচিত হয়েছিল।

আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ আল-হাকিম নিশাপুরী জন্মেছিলেন ৩২১ হিজরিতে, এই নিশাপুরেই। হাদিসশাস্ত্রে তাঁর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনিই উদ্যোগ নেন শহরের আলেমদের ইতিহাস সংরক্ষণের। তাঁর লেখা তারিখু নিশাপুর হয়ে ওঠে এই নগরের আলেমদের জীবন ও জ্ঞানচর্চার এক বিশাল দলিল। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৭/১৬৩–১৬৫)

সাধারণত কোনো শহরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করেন শাসকেরা। নিশাপুরের বেলায় সেই জায়গাটা নিয়েছেন আলেমরাই।

হাদিসের এক বিশাল নগর

হাফিজ হাকিমের জীবনই নিশাপুরের জ্ঞান-পরিবেশের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। জাহাবি তাঁর জীবনীতে লিখেছেন, আল-হাকিম হাদিস নিয়েছিলেন প্রায় দুই হাজার শায়খের কাছ থেকে। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৭/১৬৩–১৬৪)

একজন আলেমের শিক্ষাজীবনে একটিমাত্র শহরেই যদি এত শায়খের দেখা মেলে, তাহলে সেখানকার জ্ঞানচর্চার ব্যাপ্তি কতখানি ছিল, তা আন্দাজ করা কঠিন নয়। নিশাপুরে হাদিস শেখা ছিল দীর্ঘ এক পরম্পরা—একজন ছাত্র এক শায়খের কাছে শুনে যেতেন আরেকজনের কাছে, তারপর ফিরে এসে নিজের অর্জিত জ্ঞান পৌঁছে দিতেন পরের প্রজন্মের ছাত্রদের কাছে।

হাকিম থেকে বাইহাকি

এই ঐতিহ্য আল-হাকিমেই থেমে থাকেনি। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ছাত্রদের একজন ইমাম আবু বকর আল-বাইহাকি। হাকিমসহ বহু মুহাদ্দিসের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করেছিলেন তিনি। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৮/১৬৩–১৭০)

পরে বাইহাকি নিজেই হয়ে ওঠেন হাদিসশাস্ত্রের অন্যতম প্রধান ইমাম। তাঁর আস-সুনানুল কুবরাশু‘আবুল ইমানসহ নানা গ্রন্থ মুসলিম জ্ঞান-ঐতিহ্যে রেখে গেছে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ। হাকিমের জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ল তাঁর ছাত্রদের মধ্যে, বাইহাকি সেটিকে নিয়ে গেলেন আরও দূরে। এভাবেই একটি শহরের জ্ঞান তার ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে গেল।

ইমাম জুওয়াইনি ও গাজালির ধারা

পঞ্চম হিজরি শতকে নিশাপুরের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস নতুন বাঁক নেয়। এই পরিবেশেই উঠে আসেন আবুল মা‘আলি আবদুল মালিক ইবনে আবদুল্লাহ আল-জুওয়াইনি। নিশাপুরকেই তিনি নিজের জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বানিয়ে নিয়েছিলেন। (তাবাকাতুশ শাফেয়িয়াতিল কুবরা, ৫/১৬৫–১৬৬)

আল-বুরহানআল-ইরশাদ গ্রন্থে ইসলামি জ্ঞানকে তিনি দেখেছেন একই বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের ভেতর থেকে।

একপর্যায়ে হিজাজে অবস্থান করায় তিনি পরিচিতি পান ‘ইমামুল হারামাইন’ নামে। নিশাপুরে ফিরে আসার পর তাঁরই দরসে জ্ঞান আহরণ করেন আবু হামিদ আল-গাজালি।

গাজালি জুওয়াইনির দরস থেকে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রায় এগিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে তিনি ফিকহ, উসুল, কালাম, দর্শন ও আত্মশুদ্ধির প্রশ্নকে এক বিস্তৃত চিন্তাকাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসেন।

জুওয়াইনির পাঠশালা থেকেই গাজালির বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রা এগিয়ে চলে। পরবর্তীকালে ফিকহ, উসুল, কালাম, দর্শন ও আত্মশুদ্ধির প্রশ্নগুলোকে তিনি একটি বিস্তৃত চিন্তাকাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসেন।

নিজামিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ

নিশাপুরের জ্ঞানচর্চা কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগ আর মজলিশে আটকে থাকেনি। নিজামুল মুলকের উদ্যোগে গড়ে ওঠা নিশাপুরের নিজামিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেছেন ইমাম জুওয়াইনি।

জ্ঞান তখন ঢুকে পড়ল প্রতিষ্ঠানের কাঠামোর ভেতর। শিক্ষক, ছাত্র, নির্ধারিত দরস আর আবাসনের ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে দাঁড়িয়ে গেল একটি ধারাবাহিক শিক্ষাব্যবস্থা।

রাজনীতি, আক্রমণ ও ধ্বংস

তাহিরি শাসকদের আমলে নিশাপুর খোরাসানের রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেও বিশেষ গুরুত্ব পায়। ইবনু হাওকাল লিখেছেন, তাহিরিরা কেন্দ্র সরিয়ে আনার পর শহরের আবাদ, আয়তন আর সম্পদ—সবই বেড়ে যায়। (সুরাতুল আরদ, পৃষ্ঠা ৪৩৬–৪৩৭)

সমৃদ্ধির সঙ্গে বিপর্যয়ও এসেছিল। সেলজুক যুগে ঘুজদের আক্রমণ এবং পরবর্তী সময়ে ৬১৮ হিজরিতে মঙ্গোল বাহিনী খোরাসানে প্রবেশ করলে নিশাপুর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়ে।

সমৃদ্ধির পিঠে পিঠেই এল বিপর্যয়। সেলজুক আমলে ঘুজদের হামলা, আর তারপর ৬১৮ হিজরিতে মঙ্গোল বাহিনীর খোরাসানে ঢুকে পড়া—নিশাপুরকে ঠেলে দিল ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মুখে। (আল-কামিল ফিত তারিখ, ১২/৩৬৩–৩৬৫)

যে শহরে একসময় হাজারো শায়খের মজলিশ বসত, সেই শহরই যুদ্ধের আগুনে বিপর্যস্ত হলো। নগর ভেঙে পড়ল, মানুষ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। কিন্তু নিশাপুরের সবচেয়ে দামি সম্পদটি রয়ে গেল মানুষের স্মৃতিতে আর লেখা গ্রন্থের পাতায়।

একটি শহরের চেয়েও বড়

নিশাপুরের ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, সভ্যতার শক্তি কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। নিশাপুর এমন মানুষ তৈরি করেছিল, যাঁদের চিন্তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পড়া হচ্ছে। হাকিম ও বাইহাকি সংরক্ষণ করেছেন হাদিস, জুওয়াইনি ও গাজালি চিন্তাকে দিয়েছেন বিস্তার।

আজ নিশাপুরের মসজিদ কিংবা মাদ্রাসাগুলো আর আগের মতো নেই। কিন্তু সেখানকার আলেমরা আজও বেঁচে আছেন—তাঁদের গ্রন্থের পাতায়, মুসলিম সভ্যতার স্মৃতিতে। নিশাপুর তাই আমাদের শেখায়, একটি শহরের প্রকৃত মহত্ত্ব মাপা হয় সেটি কতগুলো মনকে জাগিয়ে তুলতে পেরেছিল, তা দিয়ে।

ইফতেখারুল হক হাসনাইন: আলেম ও লেখক

সূত্র: প্রথম আলো

২ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

প্রতিদিন সহজে পালনযোগ্য ৭ পুণ্যময় আমল

প্রতিদিন সহজে পালনযোগ্য ৭ পুণ্যময় আমল