করোনার কালো ছায়া ঘিরে ধরেছিল বাংলাদেশকেও। অচেনা প্রাণঘাতী ভাইরাসের কাছে তখন অসহায় গোটা বিশ্ব। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভেসে আসা অগণিত মৃত্যুর মিছিলের খবর ও ছবি বাড়াচ্ছিল শঙ্কা। তখনো তৈরি হয়নি ভ্যাকসিন, নির্দিষ্ট ওষুধও জানা নেই। ভাইরাসটি সরাসরি আক্রমণ করে শ্বাসতন্ত্রে; সংকটাপন্ন রোগীর ফুসফুস আকুলি-বিকুলি করে এক ফোঁটা অক্সিজেনের জন্য।
বাংলাদেশে তখন বাণিজ্যিকভাবে অক্সিজেন সরবরাহকারী সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানের দৈনিক সক্ষমতা ছিল ১২০ টন। পার্শ্ববর্তী দেশে করোনা মহামারির রূপ নিলে একপর্যায়ে ঘোষণা আসে — নিজেদের রোগীদের চাহিদা মেটাতে আর অক্সিজেন রপ্তানি করা হবে না। আসন্ন সংকটে বাংলাদেশে অক্সিজেনের জোগান আসবে কোথা থেকে, এ নিয়ে তৈরি হয় তীব্র উদ্বেগ। সেই সংকটকালে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসায় অতিজরুরি হয়ে ওঠা অক্সিজেনের প্রয়োজন মেটাতে এগিয়ে আসে আবুল খায়ের গ্রুপ (একেজি)।
২০২০ সালের এপ্রিলে প্রতিষ্ঠানটি সিদ্ধান্ত নেয়, দেশের মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হবে তাদের অক্সিজেন প্ল্যান্ট। অক্সিজেন সংকট আরও তীব্র হতে পারে — এই আশঙ্কার খবর তখন প্রতিদিনই মানুষকে উদ্বিগ্ন করছিল। একেকটি সাধারণ সিলিন্ডার ১০ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছিল এমন অনেক মানুষকে, যাঁদের দৈনিক রোজগারের পথও তখন বন্ধ। একই দিনে অক্সিজেনের অভাবে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর উদ্বেগ বাড়ায় আরও। এই পরিস্থিতিতে একেএস স্টিল কারখানায় স্থাপিত দৈনিক ২৬০ টন উৎপাদনক্ষমতার দেশের সর্ববৃহৎ অক্সিজেন প্ল্যান্ট নিয়ে এগিয়ে আসে গ্রুপটি।
প্রতিষ্ঠানটি ঘোষণা দেয়, যত দিন বাংলাদেশের মানুষের অক্সিজেন লাগবে, তত দিন প্রয়োজনে কারখানার স্টিল উৎপাদনই বন্ধ রাখা হবে। আর এই অক্সিজেন দেশের মানুষ পাবে একেবারে বিনা মূল্যে। শিল্পে ব্যবহৃত অক্সিজেনকে চিকিৎসার উপযোগী মেডিকেল গ্রেডে রূপান্তরের জন্য নিজস্ব খরচে নতুন ইউনিটও বসায় তারা। নিজেদের পরিবহনব্যবস্থায় সিলিন্ডারে ভরে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া হয় সারা দেশে।
শুধু তা-ই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বড় হাসপাতালগুলোতে নিজ খরচে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থাও গড়ে দেয় একেজি। ১৫টি জেলায় গড়ে তোলা হয় অক্সিজেন ব্যাংক। হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ সংকট দেখা দিলে প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে তৈরি হয় একাধিক আইসিইউ ইউনিট। সাধারণ মানুষের জন্য খোলা হয়েছিল বিশেষ হটলাইন — ফোন দেওয়া মাত্রই রোগীর কাছে সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া ও রিফিল করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল তারা।
শুরুর দিকে সারা দেশের হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছিল হাজার হাজার অক্সিজেন সিলিন্ডার; খালি হয়ে আসা সিলিন্ডারগুলোও রিফিল করে দেওয়া হয়। সে সময় দেশের প্রায় সব মানুষ ঘরবন্দী। আর আবুল খায়ের গ্রুপের কর্মীরা নিজেদের স্বাস্থ্যসুরক্ষার কথা না ভেবে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে গেছেন হাসপাতাল ও সাধারণ মানুষের কাছে সিলিন্ডার পৌঁছানো নিশ্চিত করতে।
কেবল অক্সিজেন নয়, কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষের দুয়ারে খাবার পৌঁছে দিতেও অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তাঁরা। সে সময় তাঁদের কেউ বাসায় রেখে এসেছেন সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুকে, কারও বাসায় বৃদ্ধ বাবা-মা। কোয়ারেন্টিনের কারণে দেশের প্রয়োজনে প্রিয়জন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রেখে কাজ করে যাওয়ার এই খবর তখন আবেগ তৈরি করে, সামাজিক মাধ্যমে প্রশংসিত হয় ব্যাপকভাবে।
করোনার প্রথম ঢেউ তীব্র হওয়ার আগেই নেওয়া হয়েছিল এসব উদ্যোগ। নিজস্ব পরিবহন নেটওয়ার্কে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কারখানা থেকে অক্সিজেন পৌঁছে যাচ্ছিল তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। ফলে দ্বিতীয় ঢেউ আসার পরও অক্সিজেন সংকট তীব্র রূপ নিতে পারেনি।
পরিস্থিতি গুরুতর হলে কী করা হবে, তা-ও ভেবে রেখেছিল প্রতিষ্ঠানটি। প্রথম পর্যায়েই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ২০টি হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করে দেয় তারা। পাশাপাশি অধিক আক্রান্ত ১৫টি জেলায় নিজস্ব অর্থায়নে গড়ে তোলে অক্সিজেন ব্যাংক, যা বিস্তৃত ছিল নীলফামারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত। আশপাশের জেলাগুলোও প্রয়োজনীয় অক্সিজেন নিতে পারত এসব ব্যাংক থেকে।
শতভাগ পরিশুদ্ধ স্টিল উৎপাদনে সুখ্যাত একেএস এভাবেই হয়ে উঠেছিল সারা বাংলাদেশের ‘অক্সিজেন’, আর আবুল খায়ের গ্রুপ হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের ‘নিশ্বাস’।