সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও চেহারা নিয়ে ঠাট্টা করার চেয়ে ‘সহজ’ আর ‘জনপ্রিয়’ কাজ সম্ভবত আর একটিও নেই। একটি ছবি, যা খুশি তা-ই মন্তব্য — আর দেখতে দেখতে হাজারো মানুষ সেই বিদ্রূপে যোগ দিয়ে অনলাইন মব তৈরি করে কারও মানসিক স্বাস্থ্যের বারোটা বাজিয়ে দেওয়া যেন এক মজার খেলা! ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগই তখন নিজেকে গুটিয়ে নেন, সরে যান অনলাইন থেকে। মেলিসা ব্লেক করলেন ঠিক উল্টোটা।
ঘটনার শুরু ২০১৯ সালের আগস্টে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মেলিসা ব্লেক তখন লেখক-সাংবাদিক হিসেবে বেশ পরিচিত; ‘সিএনএন’, ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ কিংবা ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর মতো গণমাধ্যমে ছাপা হচ্ছে তাঁর লেখা। রাজনৈতিক বিষয়ে একটি মতামত লেখার পর এক রক্ষণশীল ইউটিউবার তাঁর ছবি জুড়ে দিয়ে বানান একটি ভিডিও। তারপর মন্তব্যের ঘরে যা শুরু হলো, তা লেখাকে ঘিরে নয় — চেহারাকে ঘিরে। একজন তো লিখেই বসলেন, ছবি পোস্ট করাই বন্ধ করা উচিত তাঁর, কেননা তিনি ‘অতি কুৎসিত’।
জবাবে মেলিসা পোস্ট করলেন তিনটি সেলফি। পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, বাড়তে থাকে তাঁর অনুসারী, মনোযোগ পান আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। কিন্তু তাঁর কাছে এটি নিছক ট্রলের জবাব ছিল না; তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর মুখ নিয়ে এই বিদ্রূপ আসলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।
মেলিসার জন্ম ১৯৮১ সালে, ফ্রিম্যান-শেলডন সিনড্রোমকে সঙ্গী করে। বিরল এই জেনেটিক অবস্থার কারণে তাঁর মুখমণ্ডলের গঠনে রয়েছে কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য; আলাদা করে ঘাড় নেই, হাত-পা ও বিভিন্ন জয়েন্টের গঠনেও আছে জটিলতা — যার প্রভাব পড়ে চলাফেরা ও স্বাভাবিক নড়াচড়ায়। ৪৫ বছর বয়সী মেলিসাকে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে ২৬ বারের বেশি।
কিন্তু তাঁর গল্পকে কেবল চিকিৎসা বা প্রতিবন্ধিতার গল্প ধরলে বাদ পড়ে যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটাই। মেলিসা কখনোই নিজেকে শুধু ‘প্রতিবন্ধী নারী’ পরিচয়ে বেঁধে রাখেননি। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি ছিল তাঁর নিজেকে প্রকাশের ভাষা। ২০০৫ সালে সাংবাদিকতায় পড়াশোনা শেষে ফ্রিল্যান্স লেখক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি।
প্রথম কয়েকটি ছবির পর সিদ্ধান্ত নেন, পুরো এক বছর প্রতিদিন একটি করে সেলফি পোস্ট করবেন। প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে ছবি তোলা আর পোস্ট করা — ধীরে ধীরে তাঁর কাছে এটি হয়ে ওঠে অনেকটা মানসিক ব্যায়ামের মতো।
যে ছবি একদিন তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়েছিল, সেটিই হয়ে ওঠে আত্মরক্ষার ঢাল। মেলিসা লিখেছিলেন, ‘আমি কেমন দেখতে, তা নিয়ে আপনার মত থাকতে পারে। কিন্তু আমি দৃশ্যমান হব কি না, সেই সিদ্ধান্ত আমার।’
#MyBestSelfie নামের এই উদ্যোগে যোগ দেন আরও অনেকে, যাঁরা নিজেদের এমন সব বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেন যা আগে লুকাতে চাইতেন। একটি ব্যক্তিগত প্রতিবাদ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে সামাজিক আন্দোলনের ভাষা।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের নিয়ে সমাজে রয়েছে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব — তাঁদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো হয়, অথচ তাঁদের স্বাভাবিক উপস্থিতি অনেক সময়ই তৈরি করে অস্বস্তি।
কৈশোরে ফ্যাশন ম্যাগাজিনে নিজের মতো দেখতে কাউকে খুঁজে পাননি মেলিসা। এখান থেকেই তাঁর উপলব্ধি — দৃশ্যমানতা মানে কেবল ছবি তোলা নয়, বরং সমাজের সামনে নিজের অস্তিত্বকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।