গত ছয় মাসের বেশির ভাগ সময় হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ ছিল। প্রচলিত অর্থনৈতিক হিসাবে ইরানের অর্থনীতির এত দিনে প্রায় ভেঙে পড়ার কথা ছিল। নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন — এমন খবরের পর সোমবার ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের দর নেমে দাঁড়ায় ২০ লাখে।
যুদ্ধের আগে দৈনিক প্রায় ৬৫ কোটি ঘনমিটার গ্যাস উৎপাদিত হতো; যুদ্ধের কারণে উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৩ কোটি ঘনমিটার। লড়াই শুরুর আগেই পেট্রলের সরবরাহ দৈনিক চাহিদার চেয়ে প্রায় দুই কোটি লিটার কম ছিল। এখন অনেক শহরেই চলছে বিদ্যুতের রেশনিং। তারপরও সরকারি হিসাবে বেকারত্ব মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
বেতন ও পেনশন দেওয়া হচ্ছে, দোকানে পণ্যের সরবরাহও আছে। ব্যাংকিং খাতে বড় কোনো সংকট হয়নি, সরকার ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি, বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের বিশৃঙ্খল পতনও ঘটেনি। পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে বোমাবর্ষণ ও নৌ অবরোধের পরও ভেঙে পড়েনি ইরানের অর্থনীতি।
এর কারণ, শান্তিকালে ইরানের অর্থনীতির যেসব দুর্বলতাকে সমস্যা মনে করা হতো, যুদ্ধের সময় সেগুলোই উল্টো শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে মালিকানা অল্প কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত, বৈদেশিক মুদ্রা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত, বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগও সীমিত। রপ্তানি অর্থনীতির বড় অংশ কয়েকটি আধা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে।
প্রত্যাহার করার মতো বিদেশি পুঁজি ইরানে প্রায় নেই। দেশটির বৈদেশিক ঋণ খুবই কম, বিদেশিদের শেয়ারবাজারভিত্তিক বিনিয়োগও নগণ্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানে হামলা শুরু করলে ২৮ ফেব্রুয়ারি বন্ধ করে দেওয়া হয় তেহরান শেয়ারবাজার; প্রায় ৮০ দিন তা বন্ধ ছিল। যে বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রায় নেই, সেটি বন্ধ রাখাও সহজ।
মে মাসে বাজার খুললে যুদ্ধের পঞ্চম মাসে টেডপিক্স সূচক ৫৯ লাখ পয়েন্ট ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় সর্বকালের সর্বোচ্চে। বন্ধ হওয়ার আগে সূচকটি নেমেছিল প্রায় ৩৭ লাখে, বছরের শুরুতে যা ছিল প্রায় ৪৫ লাখ। তবে এক সপ্তাহের মধ্যেই তা আবার ৫০ লাখের নিচে নামে — অর্থাৎ এটি প্রকৃত আস্থার প্রতিফলন নয়।
মূল্যস্ফীতির তুলনায় ব্যাংকে আমানতের সুদের হার খুব কম, বৈদেশিক মুদ্রাও নিয়ন্ত্রিত। ফলে ইরানি সঞ্চয়কারীদের সামনে বিনিয়োগের বিকল্প কম। রিয়ালের অবমূল্যায়ন হিসাবে নিলে শেয়ারবাজারের এই উত্থান প্রকৃত লাভ নয়; বেরোনোর পথ বন্ধ বলেই টাকা ঢুকেছে বাজারে।
যুদ্ধের সময় কেন্দ্রীভূত অর্থনীতি সম্পদ বণ্টনেও সুবিধা দেয়। আসালুইয়েহ ও মাহশাহরের পেট্রোকেমিক্যাল কারখানাগুলোয় কাঁচামালের সরবরাহ ব্যাহত হলে সরকার রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, যাতে দেশের কারখানা চালু থাকে।
নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ব্যবস্থাও হঠাৎ গড়ে ওঠেনি। যুদ্ধের আগে কয়েক শ পুরোনো ট্যাংকার ব্যবহার করে দৈনিক ১৪ থেকে ১৮ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছিল ইরান। দেশটির তেল মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধ চলাকালে ১ হাজার ১৫০ কোটি ডলারের এবং যুদ্ধবিরতির সময়ে আরও ৬৫০ কোটি ডলারের অপরিশোধিত তেল বিক্রি হয়েছে — যা বছরের বাজেটে নির্ধারিত রাজস্বের ৬০ শতাংশের বেশি। নিষেধাজ্ঞা এই ব্যবস্থাকে দুর্বল করেনি, বরং তা গড়ে ওঠার কারণই হয়েছে।
তবে এই ধাক্কা সামলানোর মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব ধরা পড়ে ব্যাংকের হিসাব, ঋণখেলাপি, কোম্পানির দেউলিয়া হওয়া কিংবা শেয়ারবাজারে। কিন্তু ইরানের মতো নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতিতে সেই চাপ প্রকাশ পায় মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নে।