কারও মা কিংবা আপন বোনের স্তন ক্যানসার হলে ধরে নেওয়া হয়, তাঁরও এই রোগের ঝুঁকি আছে। কিন্তু রক্তের সম্পর্কের অন্য স্বজনদের কারও ক্যানসার থাকলেও কি এমন ঝুঁকির কথা বলে চিকিৎসাবিজ্ঞান? ঝুঁকি থাকলে করণীয়ই বা কী?
কিছু রোগীর স্তন ক্যানসারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জিনগত ব্যাপার। তেমন হলে ওই পরিবারের অন্য কারও মধ্যেও সেই জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে বাড়তি এই ঝুঁকি থাকে কেবল নির্দিষ্ট কিছু সম্পর্কের ক্ষেত্রেই।
এ বিষয়ে স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের অনকোলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. অরুনাংশু দাস বলেন, ‘সব স্তন ক্যানসার বংশগত নয়। কিছু রোগীর স্তন ক্যানসারের সঙ্গে বংশগত জিনের সম্পর্ক থাকে। শুধু মায়ের দিকের ইতিহাস নয়—বাবার দিকের পারিবারিক ইতিহাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বংশগত ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট জিন মা কিংবা বাবা—দুই দিক থেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে আসতে পারে।’
সব আত্মীয়ের সঙ্গে জিনগত বৈশিষ্ট্য একইভাবে মেলে না। তাই ঝুঁকি বোঝার সুবিধার্থে আত্মীয়তার ধরনগুলো জেনে নেওয়া যাক।
ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভ: মা-বাবা, আপন ভাইবোন ও নিজ সন্তান।
সেকেন্ড ডিগ্রি রিলেটিভ: আপন মামা, চাচা, খালা ও ফুফু; আপন ভাগনে-ভাগনি ও ভাতিজা-ভাতিজি; আপন দাদা-দাদি ও নানা-নানি; আপন নাতি-নাতনি; সৎভাই ও সৎবোন।
থার্ড ডিগ্রি রিলেটিভ: দাদা-দাদি ও নানা-নানিদের ভাইবোনেরা; আপন মামাতো, চাচাতো, খালাতো ও ফুফাতো ভাইবোন; প্রপিতামহ ও প্রপিতামহী।
যেসব ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি
ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভদের মধ্যে কোনো নারীর ৪০ বছর বয়স হওয়ার আগেই স্তন ক্যানসার হলে।
অন্তত একজন ফার্স্ট ডিগ্রি ও একজন সেকেন্ড ডিগ্রি রিলেটিভের যেকোনো বয়সে স্তন ক্যানসার হলে।
অন্তত দুজন ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভের যেকোনো বয়সে স্তন ক্যানসার হলে।
অন্তত তিনজন সেকেন্ড ডিগ্রি রিলেটিভের যেকোনো বয়সে স্তন ক্যানসার হলে।
অন্তত একজন ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভের দুই স্তনেই ক্যানসার হলে এবং প্রথম ক্যানসারটি ৫০ বছর বয়স পেরোনোর আগে হলে।
দুজন ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভ কিংবা একজন ফার্স্ট ও একজন সেকেন্ড ডিগ্রি রিলেটিভের যেকোনো বয়সে স্তন ক্যানসার ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসার হলে।
ধরা যাক, এই ধরনের কোনো ঘটনাই আপনার পরিবারে নেই — তাহলে জিনগত কারণে আপনার স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কম। তারপরও নিজেকে পুরোপুরি নিরাপদ ভেবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ক্যানসারকে বলা হয় ‘মাল্টিফ্যাক্টরিয়াল ডিজিজ’ — অর্থাৎ এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানা ব্যাপার-স্যাপার। কেবল নির্দিষ্ট জিনের কারণেই কারও স্তন ক্যানসার হয় না; আবার জিনগত ঝুঁকি না থাকলেও অনেকের এই রোগ হয়।
যা করবেন
টাটকা খাদ্যপণ্য বেছে নেওয়ার চেষ্টা করুন। পরিশোধিত (রিফাইন্ড) শস্যদানা, প্রক্রিয়াজাত মাংস, লাল মাংস, কোমল পানীয় ও অন্যান্য অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার-পানীয় (আলট্রা প্রসেসড ফুড বা ড্রিংক) এড়িয়ে চলুন।
সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি তীব্রতার ব্যায়াম করুন, কিংবা অন্তত ৭৫ মিনিট ভারী ব্যায়াম (হাই ইনটেনসিটি এক্সারসাইজ)।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন করুন।
ত্রিশের মধ্যেই প্রথম সন্তানধারণের চেষ্টা করুন; সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান।
হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি নিতে হলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকুন।
স্তনে নতুন গোটা, স্তনের আকার বা ত্বকের পরিবর্তন, নিপল ভেতরে ঢুকে যাওয়া, নিপল থেকে অস্বাভাবিক তরল নিঃসরণ কিংবা বগলে গোটা দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
প্রতি মাসে নিজের স্তন ও বগল পরীক্ষা করুন।
৪০ বছর বয়সের পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ম্যামোগ্রাফি স্ক্রিনিং করানো উচিত। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ঝুঁকির ভিত্তিতেই ঠিক হয় স্ক্রিনিংয়ের সময় ও ব্যবধান।
পারিবারিক কারণে ঝুঁকি বেশি থাকলে ৩০ বছর বয়স থেকেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে; প্রয়োজনে করাতে হতে পারে স্তনের এমআরআই।
পরিবারে অল্প বয়সে স্তন ক্যানসার, একাধিক সদস্যের স্তন বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসার, পুরুষের স্তন ক্যানসার কিংবা একই ব্যক্তির দুই স্তনে ক্যানসার হলে জেনেটিক কাউন্সেলিং নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
দেশে এখন স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি-সম্পর্কিত জিন পরীক্ষার সুযোগ আছে। এসব জিনের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত বিআরসিএওয়ান ও বিআরসিএটু (শরীরের স্বাভাবিক জিন, যা ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামতে সাহায্য করে এবং কোষকে ক্যানসারে রূপান্তরিত হওয়া থেকে রক্ষা করে)। এ ছাড়া পিএএলবিটু, টিপিফাইভথ্রি, চেকটু ও এটিএমসহ কিছু জিনের কারণেও ঝুঁকি বাড়তে পারে। জিন পরীক্ষার প্রয়োজন আছে কি না, তা চিকিৎসকই বলে দেবেন।