আন্তর্জাতিক

নেপালে আকস্মিক বন্যায় ১০৫ ভারতীয়সহ ৩৮৪ পর্যটক নিখোঁজ

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৬ আগস্ট ২০২৬, ১:২৩ দুপুর
নেপালে আকস্মিক বন্যায় ১০৫ ভারতীয়সহ ৩৮৪ পর্যটক নিখোঁজ
ছবি: প্রথম আলো

নেপাল ও তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে প্রবল বন্যায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৫ জন। বুধবারের এই বন্যায় রাস্তাঘাট, সেতু ও বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ প্রকল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। বিভিন্ন খবরের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ৫৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, বুধবার রসুয়া জেলায় আকস্মিক বন্যার পর নিখোঁজ হয়েছেন ৩৮৪ জন পর্যটক — এর মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি ও ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ১০৫ জন ভারতীয় পর্যটক রয়েছেন; আছেন যুক্তরাজ্যের ১২ জনও।

ভোতেকোশি নদী উত্তর নেপালের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে চীন সীমান্তের দিকে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবার সকাল ৯টার দিকে নদীটির দুই কূল উপচে পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে; ধ্বংস হয়ে যায় বেশ কয়েকটি গ্রাম, ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাস্তাঘাট ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।

এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জেলায় সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় বাসিন্দাদের বলা হয়েছে ভোতেকোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর তীর থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে।

কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিজন ভক্ত কায়স্থের বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে — একটি বরফধসে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে যায়, আর তার জেরেই ভোতেকোশিতে দেখা দেয় আকস্মিক এই বন্যা। ভোতেকোশি আসলে লেন্দে নদীরই একটি উপনদী।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, ভূমিধসের ঘটনাটি ঘটেছে মূলত নেপাল সীমান্তেই; এটি আঘাত হানে জিরং বন্দরে। এতে সীমান্তবর্তী শিগাতসে অঞ্চলে সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে বিস্তারিত আর কিছু জানায়নি তারা।

নেপাল সরকারের মুখপাত্র সস্মিত পোখরেল বলেন, ‘উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার জন্য আমরা ভারত ও চীন উভয় দেশকেই অনুরোধ জানিয়েছি।’

দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দেশটির ইয়োনহাপ বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আটজন দক্ষিণ কোরীয় কর্মী নিখোঁজ হয়েছেন; আটকা পড়েছেন আরও ১০ জন। তাঁদের উদ্ধারে পাঠানো হবে হেলিকপ্টার।

নিখোঁজদের অনেকেই কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় অংশ নেওয়া তীর্থযাত্রী বলে ধারণা করা হচ্ছে; তাঁরা যাচ্ছিলেন তিব্বতের উদ্দেশে।

কাঠমান্ডুভিত্তিক ‘টাচ কৈলাস ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বসু কুমার অধিকারী জানান, ৯৩ জন নেপালিসহ মোট ৩৯০ জন তীর্থযাত্রীর ওই সীমান্ত পার হওয়ার কথা ছিল। কাঠমান্ডু পোস্টকে তিনি বলেন, ‘বেলা তিনটা পর্যন্ত আমরা মাত্র কয়েকজনের খোঁজ পেয়েছি। বাকি কোনো তীর্থযাত্রীর সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারিনি।’

নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয়, ১৭ জন মালয়েশীয়, ৪ জন দক্ষিণ আফ্রিকান ও ৩ জন মার্কিন নাগরিক; আছেন অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসের একজন করে নাগরিকও। বাকি ১১১ জনের জাতীয়তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পানির তোড়ে নেপালে ভেসে গেছে বহু ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট। অন্যদিকে তিব্বতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই দেশের একটি স্থলবন্দরে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে; এতে জিরং কাউন্টিতে নিখোঁজ হয়েছেন বেশ কয়েকজন। সেখানে ‘ব্যাপক প্রাণহানির’ আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

নেপালের পাহাড়ি জেলা রসুয়ায় বসবাস প্রায় ৫০ হাজার মানুষের। কর্মকর্তারা জানান, নদীর পানি বইছে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে; এ কারণে উপদ্রুত স্যাপ্রু বেসি ও তিমুরে এলাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারগুলো অবতরণ করতে পারেনি।

কান্তিপুর পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ত্রাণ নিয়ে তিনটি হেলিকপ্টার রসুয়ার উদ্দেশে রওনা হলেও খারাপ আবহাওয়ায় সেগুলোকে কাঠমান্ডুতে ফিরে আসতে হয়। এতে উদ্ধার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

টেলিভিশনে সম্প্রচারিত দৃশ্যে দেখা গেছে বন্যার পানিতে ভেঙে পড়া বাড়িঘর ও ভাসমান গাড়ি; পানির তোড়ে ভেসে যেতে দেখা গেছে একটি লোহার সেতুও। প্রত্যক্ষদর্শীরা রয়টার্সকে জানান, বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে আস্ত গ্রাম।

রসুয়া জেলার প্রশাসক নরেন্দ্র পরিয়ার বলেন, ‘বড় ধরনের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।’ গ্রামের পর গ্রাম ও বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা ভেসে যাওয়ার খবর পেয়েই তিনি ভোতেকোশি নদীর তীরের বাসিন্দাদের দ্রুত উঁচু জায়গায় সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

জেলার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বি কে রয়টার্সকে বলেন, ‘যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই শুধু ধ্বংসযজ্ঞ চোখে পড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নদীর পাশের জনবসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। আমার নিজের পরিবারেরই পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছেন।’

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বস্নেত জানিয়েছেন, পানি না কমা পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারবে না।

আকস্মিক এই বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে গত বছরও একই নদীতে ভয়াবহ এক বন্যা হয়েছিল; পরে জানা যায়, তা সৃষ্টি হয়েছিল একটি হিমবাহের হ্রদ থেকে।

এদিকে নিখোঁজদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ তল্লাশি অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। বন্যা-পরবর্তী অন্য কোনো দুর্যোগ এড়াতে নজরদারি ব্যবস্থা ও আগাম সতর্কসংকেত আরও জোরদার করার তাগিদও দিয়েছেন তিনি।

সূত্র: প্রথম আলো

৩ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর