হাতে ইন্টারনেটসহ একটা স্মার্টফোন থাকলে দিন কিংবা রাতে আর কী-ই বা দরকার! অথচ অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের ক্ষতির দিকগুলো নিয়ে গবেষকেরা বলেই চলেছেন। সে কারণেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা প্রযুক্তি থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে থাকার নানা ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। স্ক্রিন থেকে খানিকটা সরে এসে বাস্তব জীবনের অভ্যাস আর শখগুলোকে ফিরিয়ে আনার সেই ভাবনা থেকেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘অ্যানালগ ব্যাগ’। প্রথমে টিকটকে ভাইরাল হওয়া এই ধারণাটি আসলে কী, লিখেছেন ফারজানা লিয়াকত।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক কনটেন্ট ক্রিয়েটর সিয়েরা ক্যাম্পবেল কিছুদিন আগে টিকটকে একটি ভিডিও দেন, যেখানে ‘অ্যানালগ ব্যাগ’ ধারণাটির ব্যাখ্যা দেন তিনি। এরপর আরও অনেক ক্রিয়েটর এটি নিয়ে ভিডিও বানিয়েছেন, আর ফলোয়াররা বাস্তব জীবনে ধারণাটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন।
অ্যানালগ ব্যাগ আসলে ছোটখাটো, সহজে বহন করা যায় এমন একটি টোট ব্যাগ। ভেতরে ফোন নয়, থাকে সময় কাটানোর নানা উপকরণ। হাই ফ্যাশনে যেখানে নানা রকম ফ্যান্সি ব্যাগের রমরমা কারবার, সেখানে এই ধারণা যেন পুরোপুরি উল্টো স্রোতে গা ভাসানো।
সম্প্রতি দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্যাম্পবেল বলেন, ‘এটি আদতে একধরনের “বিকল্প অভ্যাস”। মুঠোফোন যেমন সব সময় হাতের কাছে থাকে, অ্যানালগ ব্যাগটিও তেমন সঙ্গে থাকবে। ফোনে আমরা যেসব কাজ করতে অভ্যস্ত, সেসবের কিছু বিকল্প রাখা থাকবে এই ব্যাগে। আর এতেই কমে আসবে ফোন ঘাঁটার অভ্যাস।’
তার মানে এই নয় যে ফোন ব্যবহার একেবারে ছেড়ে দিতে হবে কিংবা সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হবে। উদ্দেশ্যটা বরং অন্য—স্ক্রিনের বাইরেও ভালো কোনো বিকল্প দিয়ে সময় কাটানোর অভ্যাসটা ফিরিয়ে আনা।
ব্যাগে কী রাখবেন
ক্যাম্পবেল নিজে ব্যবহার করেন ট্রেডার জোয়েস কোম্পানির ছোট একটি টোট ব্যাগ। তবে নির্দিষ্ট কোনো ব্র্যান্ড বা আকৃতির ব্যাগই লাগবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। পছন্দের যেকোনো ছোট ব্যাগই হয়ে উঠতে পারে আপনার অ্যানালগ ব্যাগ। ভেতরে কী থাকবে, সেটাও পুরোপুরি আপনার রুচির ব্যাপার।
শুরু করতে পারেন সহজ একটি প্রশ্ন দিয়ে—ফোনে আপনি সবচেয়ে বেশি কী করেন? যা যা মাথায় আসে, তার একটা করে বিকল্প খুঁজে নিন। বারবার সময় দেখেন? একটা হাতঘড়ি সঙ্গে রাখুন। সারাক্ষণ ক্যালেন্ডার দেখা হয়? কাগজের একটি প্ল্যানার ব্যবহার করতে পারেন।
ফোনে খবর পড়েন? ব্যাগে ঢুকিয়ে নিন একটি পত্রিকা। কাজের চাপে অনেকে বাসায় পত্রিকা রেখেও পড়ার সময় করে উঠতে পারেন না, বদলে খবর পড়েন হাতের ফোনে। অথচ পত্রিকাটা ব্যাগে ভরে নিলে বাসের সিটে বসেই পড়ে ফেলা যায়।
ব্যাগে ভরে নিতে পারেন পছন্দের কয়েকটি বই। তবে অ্যানালগ ব্যাগ কাঁধে তুললেই আপনাকে বইপোকা হয়ে যেতে হবে—এমন কোনো শর্ত নেই।
সব সময় ছবি তোলেন? সঙ্গে রাখুন ছোট একটি ক্যামেরা। আজকাল ডিজিটাল ক্যামেরার বাইরে ফিল্মের ক্যামেরাতেও ফিরছেন অনেকে, কেউ কেউ আবার ব্যবহার করছেন ইনস্ট্যান্ট প্রিন্ট ক্যামেরা।
হাত দুটোকে ব্যস্ত রাখা
এই ব্যাগের অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো হাত দুটোকে অন্য কোনো কাজে লাগিয়ে রাখা। অরিগ্যামি ভালো লাগলে সঙ্গে রাখুন কয়েকটি রঙিন কাগজ। বুনতে ভালোবাসলে ঢুকিয়ে নিন ক্রুশকাঁটা আর উলের বল।
এমব্রয়ডারি, ব্রেসলেট বানানো, কাগজের কারুকাজ, পুঁতির কাজ—এমনকি ছোট কোনো মডেল বানানোর সরঞ্জামও জায়গা পেতে পারে ব্যাগে।
যাঁরা আঁকতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য থাকতে পারে ছোট একটি স্কেচবুক ও পেনসিল। চাইলে ছোট একটা জলরঙের সেটও রাখা যায়। তবে সৃষ্টিশীল কাজ মানেই যে ছবি আঁকা বা হাতের কাজ, তা নয়। ছোট কোনো মেকানিক্যাল পাজল, রুবিকস কিউব, সুডোকু কিংবা ক্রসওয়ার্ডও চমৎকার বিকল্প হতে পারে।
মনে রাখা দরকার, লক্ষ্যটা অসাধারণ কিছু বানিয়ে ফেলা নয়। স্ক্রল করার বদলে কিছু একটা বানানো, সমাধান করা কিংবা খেলা—এটুকুই।
একা নয়, সবার সঙ্গেও
বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন? সঙ্গে নিতে পারেন লুডো বা দাবার বোর্ড। আড্ডার ফাঁকে বারবার ফোনের দিকে তাকানোর বদলে লুডো খেলতে খেলতেই গল্প জমে যায়।
ক্যাম্পবেলের নিজের পছন্দ ক্রসওয়ার্ড। কারণ এটি আশপাশের মানুষকেও সহজে আলোচনায় টেনে আনে—পাশের টেবিলে বসা কেউ হয়তো কোনো একটা প্রশ্নের উত্তর জানেন।
তাই ব্যাগে এমন কিছু রাখা যেতে পারে, যা একা যেমন উপভোগ করা যায়, তেমনি অন্যদের সঙ্গেও ভাগ করে নেওয়া যায়।
নোটবুক থেকে মানচিত্র
অ্যানালগ ব্যাগ মানেই একগাদা শখের জিনিস ভরে ফেলা নয়। ছোট একটা নোটবুকও রাখতে পারেন। মজার কোনো ঘটনা চোখে পড়ল কিংবা অদ্ভুত কোনো চিন্তা মাথায় এল—সঙ্গে সঙ্গে লিখে রাখলেন। এত দিন যেটা ফেসবুকে লিখে এসেছেন, আজ থেকে না হয় নোটবুকেই লিখলেন।
সঙ্গে রাখতে পারেন একটি মানচিত্র। পছন্দের কোনো এলাকায় হাঁটতে বেরিয়ে ফোনের লোকেশন সাইনের বদলে এবার নিজের কৌতূহলকেই পথ দেখাতে দিন। কোথাও বেড়াতে গেলে কাগজের মানচিত্র হাতে নিয়েই বেরিয়ে পড়া যায়। পকেট ডিকশনারিও রাখতে পারেন, যেকোনো ভাষার—চলতি পথে নতুন একটা শব্দ শিখে নেওয়া মন্দ কী!
ব্যাগে জায়গা পেতে পারে ডাকটিকিট, পুরোনো ছবি কিংবা ছোট কোনো সংগ্রহের জিনিস। পাখি, গাছপালা, স্থাপত্য বা স্থানীয় ইতিহাসে আগ্রহ থাকলে ছোট একটা গাইডবুকও রাখা যায়।
মোদ্দা কথা, ফোনে অকারণে কিছু দেখা বা স্ক্রল করার বদলে নিজের ইচ্ছায় কিছু একটা করা, শেখা, দেখা কিংবা আবিষ্কার করা।
ব্যাগটা আপনার নিজের মতো
অ্যানালগ ব্যাগে কী নেবেন, তার বাঁধাধরা কোনো তালিকা নেই। ঋতু বা উপলক্ষ বুঝে ব্যাগের জিনিসপত্র বদলেও নিতে পারেন। যেমন ভ্যালেন্টাইনস ডের সময় ক্যাম্পবেল বন্ধুদের জন্য কার্ড বানাতে স্ক্র্যাপবুকিংয়ের সরঞ্জাম রাখেন।
এই ধারণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকই হলো, ব্যাগটি একেবারে আপনার নিজের মতো করে সাজানো। যা করতে ভালোবাসেন, যা শিখতে চান, যা নিয়ে কৌতূহল—সবকিছুরই জায়গা হতে পারে সেখানে।
অ্যানালগ ব্যাগ আপনাকে ফোন ছেড়ে দিতে বলছে না। শুধু বলছে, ফোনের পাশাপাশি কয়েকটা বিকল্পও সঙ্গে রাখুন। ধরুন, বাসা থেকে বেরিয়ে মনে পড়ল জরুরি কিছু একটা ভুল জায়গায় রেখে এসেছেন—সেটা জানাতে চিঠি লিখতে বসার দরকার নেই, একটা ফোন করেই জানিয়ে দিন। তারপর ফোনটা রেখে দিন ব্যাগের কোনায় কিংবা পকেটে।
পরেরবার কোনো বন্ধুর অপেক্ষায় থেকে, ক্যাফেতে বসে কিংবা পথ চলতে চলতে ফোনটা পকেটে রেখে বরং চারপাশটা দেখুন। এমন অনেক কিছুই চোখে পড়বে, যা আপনাকে আনন্দ দেবে।
এই অভ্যাসটা হয়তো আপনাকে এমন কিছু দেবে, যার পর ফোনটা বের করার আর দরকারই হবে না।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান