আন্তর্জাতিক

কৈলাস-মানস সরোবরে কেন এত মানুষ যায়, কোন পথ ধরে

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ আগস্ট ২০২৬, ৮:১৬ সকাল
কৈলাস-মানস সরোবরে কেন এত মানুষ যায়, কোন পথ ধরে
ছবি: প্রথম আলো

চীনের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন নেপালের রসুয়া জেলায় কাদামাটি ও পাথর নেমে আসায় সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক দুর্যোগের পর নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৪০০ তীর্থযাত্রী, যাঁদের অন্তত ১০৮ জন ভারতীয় নাগরিক। এই ঘটনার পর আবার আলোচনায় এসেছে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, সীমান্তের তিব্বত অংশ থেকে কাদামাটি ও পাথর নেমে আসায় নেপালে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, ভেসে গেছে কয়েকটি গ্রাম।

এ পর্যন্ত নেপাল ও তিব্বতে ১৭৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে; নিখোঁজ রয়েছেন আরও প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ।

বন্যায় কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরগামী তীর্থযাত্রীদের ব্যবহৃত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পথের সড়ক-সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে চলছে উদ্ধার অভিযান।

কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও বন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম তীর্থযাত্রা। এই যাত্রায় তীর্থযাত্রীরা যান চীনের তিব্বতে অবস্থিত কৈলাস পর্বত (৬ হাজার ৬৩৮ মিটার উঁচু) ও মানস সরোবর হ্রদে।

হিন্দুদের বিশ্বাস, কৈলাস পর্বত তাঁদের দেবতা শিব ও দেবী পার্বতীর আবাসস্থল। আর মানস সরোবর বিবেচিত হয় পুণ্য হ্রদ হিসেবে — বিশ্বাস করা হয়, এই হ্রদে স্নান করলে পাপমুক্তি ঘটে, মেলে মোক্ষ। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের আত্মা যখন সংসার ও পুনর্জন্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে পরম সত্য বা ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হয়, তখন তাকে বলা হয় মোক্ষলাভ।

এই তীর্থযাত্রাকে হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো বলে মনে করা হয়। হিন্দুদের পুরাণ, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ও জৈন ধর্মবিশ্বাসে রয়েছে এর উল্লেখ। ১৯৬২ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ২০২৫ সালে আবার শুরু হয় এই যাত্রা।

তিন পথে যাওয়া যায়

তীর্থযাত্রীরা তিনটি প্রধান পথে কৈলাস-মানস সরোবরে যেতে পারেন। প্রথমটি লিপুলেখ পাস রুট (উত্তরাখণ্ড)। দিল্লি থেকে শুরু হয়ে আলমোড়া ও ধারচুলা হয়ে গুঞ্জি ও লিপুলেখ পাস (৫ হাজার ২০০ মিটার উঁচু) পেরিয়ে এই পথ ঢুকেছে তিব্বতে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও উত্তরাখণ্ড রাজ্য সরকারের সংস্থা ‘কুমায়ুন মণ্ডল বিকাশ নিগম’-এর সহযোগিতায় আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজিত হয় এই যাত্রা। ঐতিহ্যগতভাবে এ পথে বেশি উচ্চতায় হেঁটে যেতে হয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক যোগাযোগ ভালো হওয়ায় এখন সীমান্তের প্রায় কাছাকাছি পর্যন্তই গাড়িতে যাওয়া যায়।

দ্বিতীয় পথ নাথু লা পাস (সিকিম)। দিল্লি থেকে গ্যাংটক হয়ে নাথু লা পাস পেরিয়ে তিব্বতে ঢোকে এটি; যেতে হয় মূলত গাড়িতেই। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই পথে হাঁটার পরিমাণ কম বলে বয়স্কদের জন্য তুলনামূলক সহজ। তবে পুরো যাত্রায় লেগে যায় ২০ দিনেরও বেশি সময়।

তৃতীয়টি কাঠমান্ডু (নেপাল) রুট। তীর্থযাত্রীরা কাঠমান্ডু থেকে উড়োজাহাজে বা সড়কপথে যান নেপালগঞ্জ কিংবা সিমিকোট; এরপর হিলসা বা অন্য স্থলপথ হয়ে ঢোকেন তিব্বতে। সরকারি ব্যবস্থাপনার অন্য দুই পথের তুলনায় এটি বেসরকারি ট্যুর অপারেটরদের কাছে বেশি জনপ্রিয়।

কারণ এ পথের যাত্রা তুলনামূলক সহজ। দুর্গম পথে দীর্ঘ সময় হাঁটার ঝক্কি এড়াতে এখানে হেলিকপ্টারে যাতায়াতেরও সুযোগ আছে। যদিও বুধবারের আকস্মিক বন্যায় এই পথটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

কতটা কঠিন এই যাত্রা

এই তীর্থযাত্রায় পুণ্যার্থীদের উঠতে হয় ৪ হাজার ৫০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায়, যেখানে বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা কম। পথে মোকাবিলা করতে হয় প্রচণ্ড ঠান্ডা, অনিশ্চিত আবহাওয়া, ভূমিধস ও দুর্গম পথের মতো নানা প্রতিকূলতা। সবচেয়ে কঠিন অংশ কৈলাস পর্বতকে ঘিরে ৫২ কিলোমিটার প্রদক্ষিণ, যাকে বলা হয় পরিক্রমা বা কোরা। এ সময় পেরোতে হয় প্রায় ৫ হাজার ৬৩০ মিটার উচ্চতার দোলমা লা পাস।

অনুমতি লাগে যেসব

কৈলাস-মানস সরোবরে যেতে হলে ভ্রমণকারীদের নিতে হয় চীনের ভিসা, তিব্বত গ্রুপ ভিসা এবং বিশেষ আঞ্চলিক প্রবেশের অনুমতিপত্র। এসব অনুমতিপত্র কেবল অনুমোদিত ট্যুর অপারেটর বা সরকারি সংস্থার মাধ্যমেই প্রক্রিয়া করা যায়; ব্যক্তিগতভাবে বা এককভাবে ভ্রমণের অনুমতি নেই।

ভারতীয় নাগরিকেরা সরকারি ব্যবস্থাপনায় যেতে চাইলে আবেদন করতে পারেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা পোর্টালের মাধ্যমে। সে ক্ষেত্রে বয়সসীমা সাধারণত ১৮ থেকে ৭০ বছর, আর পূরণ করতে হয় শারীরিক সক্ষমতার নির্ধারিত মানদণ্ড।

বেসরকারি ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে নেপাল বা তিব্বত হয়ে গেলে ভ্রমণকারীদের ৪৫ থেকে ৬০ দিন আগেই পাসপোর্টের স্ক্যান কপিসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে হয় অনুমোদিত অপারেটরের কাছে।

সূত্র: প্রথম আলো

৫ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

৫,২০০ মিটার উঁচুতে হিমবাহধস, আধা ঘণ্টায় নদীর পানি ৩০ ফুট বেড়েই কি নেপালে এ দুর্যোগ

৫,২০০ মিটার উঁচুতে হিমবাহধস, আধা ঘণ্টায় নদীর পানি ৩০ ফুট বেড়েই কি নেপালে এ দুর্যোগ