বিনোদন

হলিউডে যেভাবে বদলে যাচ্ছে যৌনতার উপস্থাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ আগস্ট ২০২৬, ২:৩০ রাত
হলিউডে যেভাবে বদলে যাচ্ছে যৌনতার উপস্থাপন
ছবি: প্রথম আলো

এক সময় হলিউডের মূলধারার ছবিতে যৌনতা নিয়ে বেশ খোলামেলা কথাবার্তা হতো। কিন্তু গত কয়েক দশকে বড় পর্দা থেকে যৌন দৃশ্য ক্রমেই কমে এসেছে। ২০১৯ সালের একটি জরিপেও উঠে আসে, আগের ৫০ বছরের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সিনেমায় যৌন দৃশ্যের সংখ্যা কমে গেছে। একই সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যৌন সম্পর্কের প্রবণতা কমে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে নানা কথা—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো, যৌনতা নিয়ে বাড়তি সংবেদনশীলতা, কিংবা অনলাইনে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা।

তবে ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি যেন আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্ক আর যৌন পরীক্ষা-নিরীক্ষা নতুন করে সিনেমায় জায়গা করে নিচ্ছে। ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’, ‘দ্য ইনভাইট’, ‘পিলিয়ন’ কিংবা আগের ‘বেবিগার্ল’—সাম্প্রতিক এসব ছবিতে যৌনতাকে নিছক উত্তেজক উপাদান হিসেবে দেখানো হচ্ছে না; বরং তা এসেছে চরিত্রের মানসিকতা, সম্পর্ক ও আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে।

গ্রেগ আরাকির নতুন সিনেমা

এই বদলের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি গ্রেগ আরাকির ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’। নব্বইয়ের দশকের নিউ কুইয়ার সিনেমা আন্দোলনের অন্যতম চেনা মুখ আরাকি বরাবরই নিজের ছবিতে যৌনতা ও সম্পর্ক নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন। নতুন ছবিটিও তার ব্যতিক্রম নয়।

গল্পের কেন্দ্রে শিল্পজগতের তরুণ ইন্টার্ন এলিয়ট। বয়সে বড় নিয়োগকর্তা এরিকা ট্রেসির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে সে। এরিকা একজন বিখ্যাত শিল্পী; যৌনতা ও আধিপত্য নিয়ে তাঁর নিজস্ব, প্রচলিত ধারার বাইরের একটা দৃষ্টিভঙ্গি আছে। কর্মক্ষেত্রের এই অনুচিত সম্পর্ক ধীরে ধীরে জটিল হয়ে ওঠে।

আরাকি জানিয়েছেন, চিত্রনাট্য লেখার সময় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যৌনতা নিয়ে একধরনের সংকোচ তাঁর চোখে পড়েছিল। তাঁর মতে, ভুল করার ভয় অনেকের মধ্যেই বাসা বেঁধেছে—অথচ ভুলের ভেতর দিয়েই মানুষ শেখে।

চলচ্চিত্র সমালোচক ট্রাভিস উডসের ভাষায়, ‘সিনেমা আবারও যৌনতানির্ভর হয়ে উঠছে।’ তবে আশি বা নব্বইয়ের দশকের মতো সরাসরি যৌনতার প্রদর্শন নয়; নির্মাতারা বরং মূলধারার ছবিতেই যৌনতা ও যৌন আকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে খতিয়ে দেখছেন।

‘বেবিগার্ল’ থেকে ‘পিলিয়ন’

এই নতুন ধারার তালিকায় আছে হালিনা রেইনের ‘বেবিগার্ল’। নিকোল কিডম্যান অভিনীত ছবিটিতে ক্ষমতাধর এক করপোরেট নির্বাহী কর্মক্ষেত্রে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখলেও ব্যক্তিগত জীবনে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আকাঙ্ক্ষার মুখোমুখি হন। তরুণ এক কর্মীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সামনে নিয়ে আসে যৌনতা, ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের জটিল সমীকরণ।

ব্রিটিশ নির্মাতা হ্যারি লাইটনের ‘পিলিয়ন’-এও উঠে এসেছে যৌনতা ও সম্পর্কের অন্য এক দিক। ছবিটির গল্প এক লাজুক তরুণ সমকামী পুরুষের প্রেমে পড়াকে ঘিরে। সম্পর্কটি কেবল যৌন আকর্ষণের নয়—আবেগ, প্রত্যাশা আর হৃদয়ভাঙারও।

এ ধরনের ছবির বিশেষত্ব হলো, এখানে যৌনতাকে সব সময় গুরুগম্ভীর বা নিষিদ্ধ কিছু হিসেবে দেখানো হচ্ছে না। কোথাও তা মজার, কোথাও বিব্রতকর, আবার কোথাও আবেগে ভরা। অর্থাৎ যৌন অভিজ্ঞতার ভালো-মন্দ দুই দিকই গল্পের অংশ হয়ে উঠছে।

‘দ্য ইনভাইট’-এ যৌনতা নিয়ে সরাসরি আলোচনা

অলিভিয়া ওয়াইল্ডের পরিচালিত তৃতীয় ছবি ‘দ্য ইনভাইট’ এ ধারার আরেকটি নমুনা। ছবিটি তৈরি হয়েছে বহুগামী সম্পর্ক, দাম্পত্যের সংকট আর যৌনতা নিয়ে সমাজের ধারণাকে ঘিরে। ওয়াইল্ড ও শেঠ রোজেন অভিনীত এক দম্পতির জীবন নতুন মোড় নেয় মুক্তমনা এক প্রতিবেশী দম্পতির সঙ্গে পরিচয়ের পর।

ছবিটিতে সরাসরি যৌন দৃশ্য নেই, তবে দাম্পত্য যৌনতা এবং তার অভাব নিয়ে খোলাখুলি কথাবার্তা আছে। ফলে যৌনতা এখানে কেবল পর্দায় দেখানোর বিষয় নয়; বরং চরিত্রগুলোর সম্পর্ক ও মানসিক অবস্থা বোঝার একটা উপায়।

সাম্প্রতিক এসব ছবির মধ্যে একটা মিলও আছে—অনেকগুলোই বানিয়েছেন নারী কিংবা কুইয়ার নির্মাতারা। ফলে যৌনতাকে পুরুষতান্ত্রিক চোখে দেখানোর বদলে সম্পর্ক, আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতা ও আত্মপরিচয়ের জটিলতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

ঘনিষ্ঠ দৃশ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

হলিউডের বহু ছবিতে যৌন দৃশ্য দীর্ঘদিন গল্পের প্রয়োজনের চেয়ে বরং নিছক আনুষ্ঠানিকতা হয়েই ছিল। কয়েকটি ইঙ্গিতপূর্ণ শট, বিছানায় হাত কিংবা চাদরের নিচে নড়াচড়া—তারপরই দৃশ্য শেষ। এতে চরিত্রের সম্পর্ক বা গল্পে বাড়তি কিছু যোগ হতো না।

এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন ‘ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর’। যৌন দৃশ্যের শুটিংয়ে অভিনয়শিল্পীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি দৃশ্যের প্রতিটি মুহূর্ত পরিকল্পনা করাও তাঁদের দায়িত্ব। ফলে এখন এমন দৃশ্য আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতনভাবে ও পরিকল্পনা করে নির্মাণ করা যাচ্ছে।

শুধু শরীর নয়, ক্ষমতার সম্পর্কও

সাম্প্রতিক ছবিগুলোতে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য নির্মাণে বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো। এর কারণ কেবল দৃশ্যগত আকর্ষণ নয়—এসব সম্পর্কের ভেতর দিয়ে ক্ষমতার প্রশ্নটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‘বেবিগার্ল’-এর চরিত্রের মতোই ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’-এর এলিয়টও নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষার ভেতর দিয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে। কর্মজীবনে যে মানুষটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, তার কাছে অন্যের নিয়ন্ত্রণে থাকাটাই হয়ে উঠতে পারে একধরনের স্বস্তি। অর্থাৎ যৌন আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় মানুষের নিজের প্রয়োজন ও মানসিকতার এমন দিক সামনে এনে দেয়, যা সে আগে নিজেও টের পায়নি।

চলচ্চিত্র সমালোচক জুরডেইন সার্লসের মতে, এসব চরিত্র নিজেদের যৌন কল্পনার ভেতর দিয়েই আত্মপরিচয় খুঁজে নেয়। ‘পিলিয়ন’ ও ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’—দুটি ছবিতেই যৌনতাকে দেখা হয়েছে আবেগ ও মনস্তত্ত্বের জায়গা থেকে।

আনন্দের পাশাপাশি আছে ঝুঁকিও

তবে যৌন আকাঙ্ক্ষার পিছু নেওয়া সব সময় সুখের হয় না। ‘বেবিগার্ল’-এ নিকোল কিডম্যানের চরিত্রের সম্পর্ক তাঁর ক্যারিয়ার আর দাম্পত্য—দুটোকেই ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’-এও এলিয়টের জীবন জটিল হয়ে পড়ে। ফলে এসব ছবি যৌনতাকে কেবল আনন্দের বিষয় হিসেবে হাজির করে না; আনন্দের সঙ্গে থাকে অস্বস্তি, ভুল, বিব্রতকর পরিস্থিতি আর মানসিক আঘাতও।

‘পিলিয়ন’-এও যৌনতা আর ভালোবাসার সীমারেখা নিয়ে একই রকম জটিলতা দেখা যায়। যৌন আকর্ষণকে কখন যে ভালোবাসা ভেবে ভুল হয়ে যায়, ছবিটি সেটিও দেখিয়ে দেয়।

অলিভিয়া ওয়াইল্ড সম্প্রতি যৌনতা নিয়ে অস্বস্তিতে থাকা তরুণদের উদ্দেশে বলেছেন, জীবনে বিব্রতকর অভিজ্ঞতা থাকাটাই স্বাভাবিক। তাঁর বক্তব্যের সারকথা—জীবনে কোনো বিব্রতকর মুহূর্ত না থাকলে সেই জীবন হয়তো ভীষণ একঘেয়ে।

বিবিসি অবলম্বনে

সূত্র: প্রথম আলো

৪ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

দর্শকদের রুচি কেমন, কী দেখছেন নেটফ্লিক্সে

দর্শকদের রুচি কেমন, কী দেখছেন নেটফ্লিক্সে