কলম্বোয় আজ জয় পেলেই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকায় বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে চার নম্বরে উঠে যেত ভারত। কিন্তু শ্রীলঙ্কার জেদি প্রতিরোধের সামনে শুবমান গিলের দলকে শেষ পর্যন্ত ড্র নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। ফলে চারে রয়ে গেল বাংলাদেশ, ভারত থাকল পাঁচেই।
এই টেস্টে জিতলে ভারতের পয়েন্ট শতাংশ (পিসিটি) গিয়ে দাঁড়াত ৫৭.৫৭-তে, যা বাংলাদেশের ৫৫.৫৬ ছাড়িয়ে যেত। কিন্তু সোনাল দিনুশার অপরাজিত ১৩৩ রানের লড়াকু ইনিংসে ম্যাচটি সমতায় শেষ হওয়ায় ভারতের পিসিটি এখন ৫১.৫২ শতাংশ। অর্থাৎ ৪০ পয়েন্ট আর ৫৫.৫৬ পিসিটি নিয়ে বাংলাদেশ চারে, আর ৬৮ পয়েন্ট ও ৫১.৫২ পিসিটি নিয়ে ভারত পাঁচে।
তবে এই চক্রের এখনো অনেকটা পথ বাকি। শীর্ষ পাঁচ দলের প্রত্যেকেরই হাতে বেশ কয়েকটি টেস্ট আছে। চিরাচরিতভাবে ৬০ শতাংশের কাছাকাছি পিসিটিকে ফাইনালের দৌড়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি ধরা হয়। তবু শেষ বিচারে অন্য দলগুলোর ফলাফলও বড় ভূমিকা রাখবে।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠতে শীর্ষ দলগুলোর সামনে এখন কী সমীকরণ, দেখে নেওয়া যাক।
অস্ট্রেলিয়া
ম্যাচ ১০, জয় ৮, হার ২, ড্র ০, পয়েন্ট ৯৬, পিসিটি ৮০.০০
বাকি সিরিজ (১২টি টেস্ট): দক্ষিণ আফ্রিকা (৩, অ্যাওয়ে), নিউজিল্যান্ড (৪, হোম), ভারত (৫, অ্যাওয়ে)।
৮০ শতাংশ পিসিটি নিয়ে তালিকার চূড়ায় অস্ট্রেলিয়া। হাতে থাকা ১২ টেস্টের মধ্যে পাঁচটি ভারতের বিপক্ষে, চারটি নিউজিল্যান্ডের মাটিতে, বাকি তিনটি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। ৬০ শতাংশ পিসিটি ধরে রাখতে প্যাট কামিন্সদের আরও ৬৩ পয়েন্ট চাই—পাঁচটি জয় আর একটি ড্র হলেই যা মিলে যায়। এমনকি বাকি ১২ টেস্টে ৮ জয় ও ৪ হার হলেও তাদের পিসিটি থাকবে ৭২.৭৩ শতাংশে। আর সব কটি জিতলে ২৪০ পয়েন্ট ও ৯০.৯১ শতাংশ পিসিটি নিয়ে চক্র শেষ করবে তারা। ফাইনালের দৌড়ে তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে আরামদায়ক জায়গায় অস্ট্রেলিয়াই।
দক্ষিণ আফ্রিকা
ম্যাচ ৪, জয় ৩, হার ১, ড্র ০, পয়েন্ট ৩৬, পিসিটি ৭৫.০০
বাকি সিরিজ (১০টি টেস্ট): অস্ট্রেলিয়া (৩, হোম), বাংলাদেশ (২, হোম), ইংল্যান্ড (৩, হোম), শ্রীলঙ্কা (২, অ্যাওয়ে)।
পাকিস্তানে ১–১ সমতা আর ভারতের মাটিতে ২–০ ব্যবধানে সিরিজ জিতে অনেকটা কাজ এগিয়ে রেখেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। বাকি ১০ টেস্টের আটটিই তাদের ঘরের মাঠে। ৬০ শতাংশ পিসিটি ধরে রাখতে দরকার আরও ৬৫ পয়েন্ট—পাঁচ জয় ও দুই ড্রয়েই যা সম্ভব। বাকি ১০ টেস্টে ৬ জয় ও ৪ হার হলে পিসিটি দাঁড়াবে ৬৪.২৯ শতাংশ, আর ৭ জয় ও ৩ হার হলে তা বেড়ে হবে ৭১.৪৩ শতাংশ। ঘরের মাঠের এই সুবিধাটা কাজে লাগাতে পারলে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা বেশ ভালো।
নিউজিল্যান্ড
ম্যাচ ৬, জয় ৪, হার ১, ড্র ১, পয়েন্ট ৫২, পিসিটি ৭২.২২
বাকি সিরিজ (১০টি টেস্ট): ভারত (২, হোম), শ্রীলঙ্কা (২, হোম), অস্ট্রেলিয়া (৪, অ্যাওয়ে), পাকিস্তান (২, অ্যাওয়ে)।
নিজেদের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানো আর ইংল্যান্ডের মাটিতে সিরিজ জেতা—দুইয়ে মিলে কিউইরা এখন স্বস্তিদায়ক অবস্থানে। বাকি ১০ ম্যাচের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া সফরটাই তাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। ৬০ শতাংশ পিসিটিতে পৌঁছাতে তাদের অন্তত ৬৪ পয়েন্ট চাই। ছয় জয় ও চার হারে বাকি ম্যাচগুলো শেষ করলে পিসিটি হবে ৬৪.৫৮ শতাংশ, আর সাত জয় ও তিন হার হলে তা দাঁড়াবে ৭০.৮৩ শতাংশে। ঘরের মাঠে ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে হারানোর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া সফর থেকেও পয়েন্ট তুলতে হবে তাদের।
বাংলাদেশ
ম্যাচ ৬, জয় ৩, হার ২, ড্র ১, পয়েন্ট ৪০, পিসিটি ৫৫.৫৬
বাকি সিরিজ (৬টি টেস্ট): ওয়েস্ট ইন্ডিজ (২, হোম), দক্ষিণ আফ্রিকা (২, অ্যাওয়ে), ইংল্যান্ড (২, হোম)।
ম্যাকাইয়ে হারের পরও ৫৫.৫৬ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার চারে বাংলাদেশ। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় আর তার আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে সাফল্যই নাজমুল হোসেনদের এখানে তুলে এনেছে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ভারতের ড্র সেই চতুর্থ স্থানটি ধরে রাখতেও সাহায্য করল।
৬০ শতাংশ পিসিটি ছুঁতে বাংলাদেশের চাই আরও ৪৭ পয়েন্ট। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চার টেস্টেই জিতলে যোগ হবে ৪৮ পয়েন্ট, তখন পিসিটি দাঁড়াবে ৬১.১১ শতাংশে। ওই চার জয়ের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে আরেকটি জয় যোগ করতে পারলে পিসিটি হবে ৬৯.৪৪ শতাংশ। ফাইনালের স্বপ্ন সত্যি করতে হলে তাই ঘরের মাঠের পুরো সুবিধা আদায় করে নেওয়াই বাংলাদেশের প্রথম কাজ।
ভারত
ম্যাচ ১১, জয় ৫, হার ৪, ড্র ২, পয়েন্ট ৬৮, পিসিটি ৫১.৫২
বাকি সিরিজ (৭টি টেস্ট): নিউজিল্যান্ড (২, অ্যাওয়ে), অস্ট্রেলিয়া (৫, হোম)।
শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সিরিজ জিতেও ভারতের ফাইনালের পথটা সহজ হলো না। গল টেস্ট জেতার পর কলম্বোয় ড্র করে সিরিজ ১–০ ব্যবধানে জিতেছে তারা। তাতে ৬৮ পয়েন্ট নিয়ে পাঁচেই থেকে গেল দলটি। সামনে বাকি নিউজিল্যান্ডের মাটিতে দুটি এবং ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাঁচটি টেস্ট।
৬০ শতাংশ পিসিটিতে উঠতে ভারতের অন্তত আরও ৬২ পয়েন্ট চাই। অর্থাৎ বাকি সাত টেস্টের ছয়টিতেই জিততে হবে। কিংবা পাঁচটি জয়ের সঙ্গে দুটি ড্র হলেও তারা ৬০ শতাংশের ওপরে, প্রায় ৬৩ শতাংশে পৌঁছে যাবে। ছয় জয় ও এক হারে পিসিটি দাঁড়াবে ৬৪.৮১ শতাংশ।
কিন্তু দুটি ম্যাচ হেরে গেলে কাজটা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তখন বাকি পাঁচ টেস্ট জিতলেও পিসিটি থামবে ৫৯.২৬ শতাংশে। আর সাতটি টেস্টই জিতলে গিলের দল সর্বোচ্চ ৭০.৩৭ শতাংশে উঠতে পারবে। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ের সুযোগ হাতছাড়া করার পর ভুল করার জায়গা ভারতের হাতে খুব কমই রইল।
শুধু নিজেদের ফল দিয়েই অবশ্য ভারতের ফাইনাল নিশ্চিত হবে না। অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডের মতো দলগুলো সামনে একে অপরের বিপক্ষেও খেলবে। সেই পারস্পরিক লড়াইয়ে পয়েন্ট ভাগাভাগি হলে ভারতের সামনে সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে নিউজিল্যান্ড সফরে এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাঁচ টেস্টের সিরিজে বড় সাফল্য পেতেই হবে তাদের।
পয়েন্ট গোনা হয় যেভাবে
টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে জয়ের জন্য একটি দল পায় ১২ পয়েন্ট, টাই হলে দুই দল পায় ৬ পয়েন্ট করে, আর ড্রয়ে মেলে ৪ পয়েন্ট করে। হারলে কিছুই জোটে না। তবে সব দল সমানসংখ্যক ম্যাচ খেলে না বলে মোট অর্জিত পয়েন্ট নয়—মোট সম্ভাব্য পয়েন্টের কত শতাংশ একটি দল পেল, সেই হিসাব বা পিসিটি দিয়েই তালিকার অবস্থান ঠিক হয়।