রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক এলাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকের এটিএম বুথে নিরাপত্তা প্রহরীর কাজ করেন ৫৮ বছর বয়সী অহিদুল ইসলাম। ১৬ বছর আগে যখন এই পেশায় আসেন, তখন তাঁর মূল বেতন ছিল প্রায় আড়াই হাজার টাকা; এখন পান ৯ হাজার ৩৩৩ টাকা। অতিরিক্ত সময় কাজ করলে মাস শেষে হাতে আসে ১৪ থেকে ১৬ হাজার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সারা দেশে ব্যাংকগুলোর শাখা-উপশাখা ১৬ হাজারের বেশি, এটিএম বুথ প্রায় ১০ হাজারের বেশি। এসব জায়গায় নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মীদের প্রায় সবাই বিভিন্ন নিরাপত্তাসেবা কোম্পানির সরবরাহ করা ‘আউটসোর্স’ কর্মী।
শুধু ব্যাংক খাতেই নয়—অফিস, বাণিজ্যিক ভবন, শিল্পকারখানা থেকে কূটনৈতিক মিশন পর্যন্ত সবখানেই এখন দেখা মেলে বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানির কর্মীদের। তাঁদের সংখ্যার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে এ খাতের কোম্পানিগুলোর অন্যতম বড় সংগঠনটির দাবি, সারা দেশে নিরাপত্তাকর্মী আছেন পাঁচ লাখের বেশি।
প্রথম আলোর অনুসন্ধান বলছে, এই কর্মীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কম বেতন। এর সঙ্গে আছে দৈনিক ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টার ডিউটি, দেরিতে বেতন পাওয়া, সাপ্তাহিক ছুটি না থাকা আর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অভাব। ঘুম, চিকিৎসা কিংবা খাওয়া—কোনো কিছুতেই স্বস্তি নেই।
দুই মাস ধরে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের অন্তত ৮০ জন নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো, যাচাই করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট নানা নথিপত্র। কথা হয়েছে সরকারি সংস্থা, নিয়োগদাতা ও সেবাগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান, সমিতি এবং শ্রম বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও।
শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি নিরাপত্তা খাতে রাষ্ট্রীয় কোনো তদারকি সংস্থার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। এ খাতের জন্য একটি নিম্নতম মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা আছে। তবে এসব মানা হচ্ছে না।
আইন ও বিধি অনুযায়ী দেশে বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানিগুলোকে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) কাছ থেকে আলাদা নিবন্ধন নিতে হয়। কিন্তু সেই নিবন্ধন নেওয়ার নজির প্রায় নেই, নেই তদারকিও। কোম্পানিগুলো বলছে প্রক্রিয়াগত জটিলতার কথা।
শ্রম বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এই খাতে রাষ্ট্রীয় কোনো তদারকি সংস্থার কার্যকর নিয়ন্ত্রণই নেই। খাতটির জন্য একটি নিম্নতম মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা আছে, শ্রম বিধিমালায় আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে মজুরি নির্ধারণের আলাদা শর্তও রয়েছে। কিন্তু মানা হয় না কিছুই।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলছেন, বড় কয়েকটি নিরাপত্তা কোম্পানি হয়তো কিছু ক্ষেত্রে মানদণ্ড মেনে চলে, কিন্তু বেশির ভাগই থেকে যায় নজরদারির বাইরে। নিরাপত্তাকর্মীদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনাও হয় না তেমন।
‘যা বেতন পাই, তাতে পেট চলে না’
বিজ্ঞাপন
কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁরা প্রতিদিন অন্তত ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন। আট ঘণ্টার কাজে বেশির ভাগেরই বেতন ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা; ওভারটাইম করলে আয় দাঁড়ায় ১৪ থেকে ১৬ হাজারে। ব্যাংক থেকে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান—সবখানেই ছবিটা মোটামুটি এক। কিছু প্রতিষ্ঠানে অবশ্য কর্মীরা ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকাও পান, তবে সেই সংখ্যা কম। কিছু কোম্পানি সামান্য বোনাস ও ঝুঁকিভাতা দেয়, বাকিরা তা-ও দেয় না।
বেসরকারি নিরাপত্তাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর একাধিক সংগঠন আছে। বড় কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ প্রাইভেট সিকিউরিটি সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএসএসপিএ)। তাদের তথ্য বলছে, নিরাপত্তাকর্মীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কাজ করেন ঢাকায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীতে কাজ করা বেশির ভাগ কর্মীই পরিবারকে রাখেন গ্রামে। তেমনই একজন ইসরাফিল হোসেন, কাজ করেন তেজগাঁও এলাকায় একটি বহুজাতিক কোম্পানির অফিসে। তিনি বলেন, ‘২০০৪ সাল থেকে এ কাজে আছি। এত বছর ঢাকায় থাকি। ফ্যামিলি লগে থাকা তো দূর, তাগো ঢাকায় আইনা কয়দিন রাখুম, সেই সাহসও করি না। যা বেতন পাই, তাতে পেট চলে না।’
২০২২ সালে এই খাতের জন্য নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করে শ্রম মন্ত্রণালয়। সেই হিসাবে বিভাগীয় শহর ও সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বনিম্ন মজুরি ৯ হাজার ৮০০ টাকা, জেলা শহর ও অন্যান্য এলাকায় ৯ হাজার ১৪০ টাকা। অথচ এই প্রতিবেদনের জন্য কথা বলা ৮০ জনের মধ্যে অন্তত ৩০ জনই জানিয়েছেন, তাঁরা এর চেয়েও কম পান।
শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছরের মূল্যস্ফীতি ধরলে এবং অন্য আনুষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে তুলনা করলে নির্ধারিত এই নিম্নতম মজুরিটাই অনেক কম। যেমন তৈরি পোশাক খাতে এখন নিম্নতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
বিপিএসএসপিএ বলছে, মজুরি পর্যালোচনার জন্য তারা ধারাবাহিকভাবে ‘বাংলাদেশ সর্বনিম্ন মজুরি বোর্ড’ পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। সংগঠনটির সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) খালিদ আজম বলেন, ‘সম্প্রতি শ্রম মন্ত্রণালয় আমাদের জানিয়েছে যে, তারা বোর্ড পুনর্গঠন করবে। আমরা আশা করছি, এবার একটি উন্নত ও টেকসই মজুরি নির্ধারিত হবে।’
মজুরির অন্য হিসাব
মজুরির আরেকটি হিসাবও আছে। ২০২২ সালে সংশোধিত শ্রম বিধিমালা বলছে, আউটসোর্স করা কর্মীরা যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন, সেই খাতের সর্বনিম্ন মজুরিই তাঁদের প্রাপ্য; সরবরাহকারী কোম্পানি তার চেয়ে কম দিতে পারবে না। বিধিমালায় আরও বলা আছে, ঠিকাদার সংস্থা ও কর্মী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তিতে প্রত্যেক কর্মীর জন্য যে মজুরি ও ভাতা ধরা হবে, তার চেয়ে কম টাকা দেওয়া চলবে না। কিন্তু এসব নিয়ম মানার নজির কমই।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিল, বিভাগীয় শহরে ব্যাংকের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও অফিস সহায়কের মতো পদে ন্যূনতম বেতন-ভাতা হবে ২৪ হাজার টাকা; আউটসোর্স কর্মীদেরও দিতে হবে সেই অনুপাতেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রজ্ঞাপনটি অবশ্যই মানতে হবে। আউটসোর্স কর্মীর বেতনের সঙ্গে স্থায়ী সম-পদের বড় পার্থক্য বা বৈষম্য থাকা চলবে না।
বিজ্ঞাপন
বিপিএসএসপিএ অবশ্য বলছে, চুক্তির চেয়ে কম বেতন দেওয়ার অভিযোগ তাদের কাছে নেই। তবে বেশির ভাগ চুক্তিতেই উল্লেখ থাকে কেবল সার্ভিস চার্জ, কর্মীর বেতন নয়।
সংগঠনটির মহাসচিব ফারহান কুদ্দুস বলছেন, সমস্যাটা দ্বিমুখী। একদিকে গ্রাহকেরা বেশি টাকা দিতে চান না, কম রেটে কাজ করানোর জন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা তৈরি করেন; অন্যদিকে কাজ পেতে কোম্পানিগুলোও মরিয়া। তাঁর মতে, সর্বনিম্ন মজুরির নিচে সেবা বিক্রির জন্য এককভাবে সিকিউরিটি কোম্পানি দায়ী নয়—আইন লঙ্ঘনের দায়ে গ্রাহক প্রতিষ্ঠানকেও জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।
এদিকে ২০২৫ সালের এপ্রিলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাসেবা আউটসোর্স করার সময় অগ্রাধিকার দিতে হবে আনসার সদস্যদের। ঢাকা মহানগরীতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে তাঁদের সর্বনিম্ন বেতন ১৮ হাজার ১৮০ টাকা। হাতেগোনা যে কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী নেয়, তার একটি বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে কর্মীরা পান ১৮ হাজার টাকা, আর টাকাটা যায় সরাসরি তাঁদের ব্যাংক হিসাবে। কোম্পানির সার্ভিস চার্জ বাংলাদেশ ব্যাংক দেয় আলাদা করে।
দিন-রাতের ঠিক নেই
কারওয়ান বাজারের একটি করপোরেট ভবনে কাজ করেন নিরাপত্তাকর্মী শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমার নরমাল ডিউটি ১২ ঘণ্টা। ওভারটাইম থাকলে ১৪-১৬ ঘণ্টা কাজ হয়। মাঝে মধ্যে টাকার সমস্যায় পড়লে স্যারগো টানা ওভারটাইম দিতে বলি।’
নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়ে ২০১৭ সালে একটি গবেষণা করেছিল বেসরকারি সংস্থা বিলস। তাতে দেখা যায়, এই খাতের ৮০ শতাংশের বেশি কর্মী দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন, আর ২৪ শতাংশ কাজ করেন ১৫ ঘণ্টারও বেশি। অর্ধেকের বেশি কর্মী কাজ করেন বিরতি ছাড়াই একটানা। এমনকি ৮৮ শতাংশ কর্মী মে দিবসেও ছুটি পান না। এ খাতের কর্মীদের কোনো ট্রেড ইউনিয়নও নেই।
ঢাকায় ৩৮ জন নিরাপত্তাকর্মী এ প্রতিবেদককে বলেছেন, অন্য কাজের সুযোগ পেলে এ পেশা ছেড়ে দেবেন। এর পেছনে তাঁরা তিনটি প্রধান কারণের কথা বলেছেন—কম বেতন, বেশি কর্মঘণ্টা এবং রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটা।
অনেকেই, বিশেষ করে তরুণেরা, এই কাজকে দীর্ঘমেয়াদি পেশা হিসেবে নিতে চান না। ঢাকায় ৩৮ জন কর্মী প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, অন্য কাজের সুযোগ পেলেই তাঁরা এ পেশা ছেড়ে দেবেন। কারণ হিসেবে তাঁরা বলেছেন তিনটি কথা—কম বেতন, বেশি কর্মঘণ্টা আর রাতে ঘুমের ব্যাঘাত। এর সঙ্গে আছে খাওয়ার সমস্যা, রোদের মধ্যে টানা ডিউটি, টয়লেট ও বিশ্রামের সুযোগের অভাব।
আদাবর এলাকার একটি এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মী রাজ্জাক হোসেন বলেন, ‘বুথ ছেড়ে কোথাও বেশি সময়ের জন্য যাওয়া যায় না। নামাজ পড়ি বুথের মধ্যেই। এই বিল্ডিংয়ে একটা মেসের টয়লেট কয়জন মিলে ব্যবহার করি। কিন্তু প্রায়ই সিরিয়াল দিতে হয়।’
শ্রম বিধিমালা অনুযায়ী একজন কর্মীকে একই দিনে একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করানো যাবে না। কিন্তু উল্টো নজিরও আছে। গুলশানে একটি ব্যাংকের অফিসে কাজ করেন জিব্রাইল হোসেন। সেখানে আট ঘণ্টা ডিউটি শেষে দুই ঘণ্টার বিরতি দিয়ে সরবরাহদাতা কোম্পানি তাঁকে পাঠায় আধা কিলোমিটার দূরের আরেকটি বহুজাতিক কোম্পানিতে—আরও ছয় ঘণ্টার কাজে।
বিজ্ঞাপন
বিপিএসএসপিএর মহাসচিব ফারহান কুদ্দুস অবশ্য বলছেন, কম মজুরির কারণে গার্ডরাই নিজেদের আয় বাড়াতে টানা অতিরিক্ত সময় কাজের দাবি জানান; সিকিউরিটি কোম্পানিগুলো এই চর্চাকে নিরুৎসাহিতই করে।
নারী কর্মীদের দশা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় শপিং মল, করপোরেট অফিস ও পোশাক কারখানায় নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ বাড়ছে। ঢাকায় ১৩ জন নারীকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কর্মক্ষেত্রে মাঝেমধ্যেই পুরুষদের তুলনায় বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির মুখে পড়েন তাঁরা। অনেক জায়গায় নারী গার্ডদের জন্য আলাদা পোশাক পরিবর্তনের কক্ষই নেই। ওভারটাইম করার সুযোগও অনেকের হয় না।
গুলশানে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অফিসে কাজ করেন সালমা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমরা টাকা একটু কমই পাই। মাঝেমধ্যে কোম্পানি দূরে (ইভেন্টে) ডিউটিতে পাঠায়। তখন বেশি অসুবিধা হয় খাওয়া আর টয়লেট নিয়ে।’
নিবন্ধনের জটিলতা, তদারকি নেই
দেশে বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু ১৯৮৮ সালে। প্রায় চার দশকে এই খাতে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য কোম্পানি। বিপিএসএসপিএ ২০২০ সালে একটি জরিপ চালিয়ে বৈধ ট্রেড লাইসেন্সধারী ৩৬৯টি কোম্পানির তথ্য পেয়েছিল; তখন তাদের কর্মীসংখ্যা ছিল আনুমানিক পাঁচ লাখ। সংগঠনটি বলছে, এখন সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে।
বিলসের ২০১৭ সালের গবেষণায় বলা হয়েছিল, তখন দেশে কাজ করছিল ৩৫০ থেকে ৪০০টি নিরাপত্তা সংস্থা, কর্মীসংখ্যা ছিল তিন লাখের কিছু বেশি—যাঁদের ৯২ শতাংশই পুরুষ।
বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা আইন ২০০৬ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছ থেকে নিবন্ধন নেওয়া বাধ্যতামূলক। আবার শ্রম বিধিমালা বলছে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মী সরবরাহ করতে হলে ডিআইএফই থেকেও নিতে হবে নিবন্ধন।
ডিআইএফইর যুগ্ম সচিব মর্যাদার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশজুড়ে মোট ১ হাজার ৫৬০টি আউটসোর্সিং কোম্পানি তাঁদের অধিদপ্তরে নিবন্ধিত ছিল। তবে এর মধ্যে নিরাপত্তা কোম্পানি কতগুলো, সেই হিসাব আলাদা করা নেই।
ইতিপূর্বে বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ডিএমপি থেকে আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। তবে বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানিগুলোকে ২ মাসের মধ্যে নিবন্ধন নিতে ১৯ আগস্ট একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। — নিয়াজ মেহেদী, অতিরিক্ত উপকমিশনার, ডিএমপি
বিজ্ঞাপন
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়েও বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানি নিবন্ধনের কোনো তথ্য নেই। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, মাসখানেক আগে তাঁরা এসব প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তাতে সারা দেশে মিলেছে ৩২৩টি কোম্পানির তথ্য, যার ২২৬টিই ঢাকায়।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী প্রথম আলোকে বলেন, ইতিপূর্বে বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ডিএমপি থেকে আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। তবে কোম্পানিগুলোকে দুই মাসের মধ্যে নিবন্ধন নিতে ১৯ আগস্ট একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এখন কোম্পানিগুলো নিবন্ধন নেবে বলে আশা করছেন তিনি।
বিপিএসএসপিএর সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) খালিদ আজম বলেন, নিরাপত্তাসেবা আইন অনুযায়ী তাঁদের ডিএমপির মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে লাইসেন্স নেওয়ার কথা, আর লাইসেন্স নিতে কোম্পানিগুলো মোটেও অনিচ্ছুক নয়। তবে ডিআইএফইর নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে বলে জানান তিনি। কারণ ডিআইএফই কোম্পানিগুলোকে কর্মী নিরাপত্তা তহবিলে টাকা জমা দিতে বলছে, যা বাড়তি খরচ। তাঁর দাবি, বড় কোম্পানিগুলো এমনিতেই গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ছুটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখে।
করণীয় কী
বেসরকারি নিরাপত্তাখাতকে অবশ্যই শ্রম আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে নির্ধারিত ন্যূনতম সুরক্ষা ও মানদণ্ডগুলো নিশ্চিত করতে হবে। — সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক, বিলস
বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি নিরাপত্তা খাতকে অবশ্যই শ্রম আইনের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে; ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে নির্ধারিত ন্যূনতম সুরক্ষা ও মানদণ্ডগুলোও নিশ্চিত করা চাই। তাঁর মতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ব্যবস্থা নেই, শ্রম আদালতও নেই। তারা বরং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট নিবন্ধন ও যাচাইয়ের কাজ করতে পারে—যেমন অস্ত্রের নিবন্ধন। বাকি দায়িত্ব শ্রম মন্ত্রণালয়ের।
তাঁর সুপারিশ, এ খাতে কর্মী নিয়োগ ও সরবরাহ চুক্তিতে মজুরি ও কর্মঘণ্টার একটি মানদণ্ড থাকা উচিত। থাকা উচিত উপযুক্ত পরিদর্শন ব্যবস্থা, কর্মীদের অভিযোগ ও দাবি জানানোর সুযোগ এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকারও।