খেলা

‘নাইট ক্লাব–কাণ্ড’ই এখন ইংল্যান্ড দলের চেনা শিরোনাম

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৬ আগস্ট ২০২৬, ৫:৩০ ভোর
‘নাইট ক্লাব–কাণ্ড’ই এখন ইংল্যান্ড দলের চেনা শিরোনাম
ছবি: প্রথম আলো

ভিডিওটা খুব পরিষ্কার নয়। একটু ঝাপসা, ক্যামেরাও কাঁপছে। তবু কী ঘটছে, বুঝে নিতে সমস্যা হয় না।

হাতকড়া পরানো অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন ইংলিশ পেসার ব্রাইডন কার্স। পেছনে ঝাপসাভাবে চোখে পড়ছেন বেন স্টোকস—সদ্য সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক। গত শনিবার রাতে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে ডার্বিশায়ারের বিপক্ষে ডারহামের জয় উদ্‌যাপন করতেই নাইট ক্লাবে গিয়েছিলেন তাঁরা। সেখানে কোনো একটা ঝামেলার পর কার্সকে আটক করে পুলিশ। হেডিংলিতে প্রথম টেস্টে জায়গা না পাওয়াতেই তিনি ওই কাউন্টি ম্যাচটি খেলছিলেন।

পরদিনই ইংলিশ সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে আবার সেই ‘নাইট ক্লাব–কাণ্ড’। নয় মাসের মধ্যে তৃতীয়বার একটা দলকে ঘিরে যখন এমন শিরোনাম হয়, সেটি যে সুখবর নয়—তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার পড়ে না।

ওয়েলিংটনে হ্যারি ব্রুক, জ্যাকব বেথেল ও জশ টাং। এরপর চেলসিতে গাস অ্যাটকিনসন ও বেন স্টোকস। এবার ডার্বিতে ব্রাইডন কার্স। এসবের আগে গত বছরের শেষ দিকে অ্যাশেজের মাঝপথে অস্ট্রেলিয়ার নুসায় ইংলিশ ক্রিকেটারদের প্রতি রাতে মদ্যপান করে মাতাল হয়ে পড়ার গল্পগুলো গোটা ইংল্যান্ডকেই নাড়িয়ে দিয়েছিল। সত্যিই কি তবে একটা চক্রের ভেতর ঢুকে পড়েছে ইংল্যান্ড?

অথচ এই মৌসুমেই টেস্টে দুটি দাপুটে জয় আছে দলটির। জুনে লর্ডসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে, আর কয়েক দিন আগে হেডিংলিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে। কিন্তু সেই সাফল্য চাপা পড়ে গেছে মাঠের বাইরের বিতর্কের নিচে। যেন ‘নাইটক্লাব–কাণ্ড’ই এখন ইংল্যান্ড দলের সবচেয়ে মানানসই শিরোনাম!

কার্সের ঘটনাটি অবশ্য কিছুটা আলাদা। হাতকড়া পরতে হলেও বড় কোনো অভিযোগ না থাকায় পুলিশ পরে তাঁকে ছেড়ে দিয়েছে। তবু ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড আগেই জানিয়ে রেখেছিল, ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হবে।

পরে বিষয়টি পাঠানো হয় স্বাধীন ক্রিকেট রেগুলেটরের কাছে। রেগুলেটরও তদন্ত শুরুর কথা নিশ্চিত করেছে। এর জেরে পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের স্কোয়াড থেকে কার্সকে বাদ দিয়ে নেওয়া হয়েছে হ্যাম্পশায়ারের পেসার সনি বেকারকে। এদিকে সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল ভন মনে করছেন, এসব ঘটনায় শুধু সমালোচনা নয়—দরকার কঠোর শাস্তি।

বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভে তিনি বলেছেন, ‘এমন একটা শাস্তি দরকার, যা পুরো ইংল্যান্ড দলকে কাঁপিয়ে দেবে। সবাই যেন বুঝতে পারে, যদি খারাপ আচরণ করো বা দলের সুনাম নষ্ট করো, তাহলে কী পরিণতি অপেক্ষা করছে।’

কথাটা অবশ্য শুধু কার্সকে লক্ষ্য করে বলা নয়। ভনের মতে, গোটা ঘটনার দায় একা কার্সের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে সেটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। তাঁর ভাষায়, ‘কার্স যদি একাই সব দায় নেয়, সেটা কঠিন হবে। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। যাতে বোঝা যায়, এই আচরণ আর মেনে নেওয়া হবে না।’

কিন্তু দায়টা আসলে কার? মদ্যপান আর মাতলামির একের পর এক ঘটনায় বেন স্টোকসের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো—কখনো সক্রিয়ভাবে, কখনো নীরব দর্শক হিসেবে। ৪–১ ব্যবধানে হারা অ্যাশেজের সময় খেলোয়াড়দের নেশাগ্রস্ত অবস্থার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ইংল্যান্ড দলে একরকম কারফিউ জারি হয়েছিল। এরপর জুনে লন্ডনের একটি নাইটক্লাবে একই ধরনের ঘটনার জেরে কারফিউ ভাঙার দায়ে স্টোকস ও গাস অ্যাটকিনসনকে লিখিত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয় তাঁদের। ওই সিরিজ চলাকালেই তৃতীয় টেস্টে হঠাৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন স্টোকস। দুই সপ্তাহের মাথায় সরিয়ে দেওয়া হয় লাল বলের কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালামকেও।

আমি সত্যি খুব বিরক্ত, ভীষণ হতাশ। আমরা একের পর এক কেন এমন সব ভুলভাল কাণ্ড করে চলেছি! এতে আমাদের মাঠের পারফরম্যান্স আর অর্জনের আলোটাই যে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
— একের পর এক নাইটক্লাব কাণ্ড নিয়ে ইংল্যান্ড অধিনায়ক জো রুট

এবারও কার্সের পাশে সেই স্টোকস। অথচ অ্যাশেজের ঘটনার জেরে জারি হওয়া সান্ধ্য আইন তুলে নেওয়ার দুই সপ্তাহও তখন পেরোয়নি। নতুন অধিনায়ক জো রুট সেই সময় সতীর্থদের কাছে অনুরোধই করেছিলেন, ‘একটু বড় হও, বড়দের মতো আচরণ করো।’ গতকাল কার্সের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তাঁকে রীতিমতো অসহায় দেখাল, ‘আমি সত্যি খুব বিরক্ত, ভীষণ হতাশ। আমরা একের পর এক কেন এমন সব ভুলভাল কাণ্ড করে চলছি! এতে আমাদের মাঠের পারফরম্যান্স আর অর্জনের আলোটাই যে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।’

আলোচনার কেন্দ্রে থাকায় স্টোকসকেও এ প্রসঙ্গে মুখ খুলতে হয়েছে। কয়েক দিন আগে ‘ফর দ্য লাভ অব ক্রিকেট’ পডকাস্টে তিনি বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, ক্রিকেটে একটা মদ্যপানের সংস্কৃতি আছে আর সেটা এখনো বদলায়নি। আমরা এখন ২০২৬ সালে আছি। বছরের পর বছর ধরে খেলাটা আরও পেশাদার হয়েছে, কিন্তু একটা জিনিস ক্রিকেটের সঙ্গে ঠিক আগের মতোই থেকে গেছে, সেটা হলো মদের সঙ্গে সম্পর্ক। এটা ঠিক সেখানেই থেকে গেছে, খেলাটার সঙ্গে মিশে গেছে।’

স্টোকসের বক্তব্যের সারকথা স্পষ্ট—খেলাটা পেশাদার হয়েছে, পানের অভ্যাসটা হয়নি। কেবল ইংল্যান্ড দলকে আলাদা করে দোষ দিয়ে তাই লাভ নেই, সমস্যাটা গোটা ক্রিকেটের ডিএনএর ভেতরেই। নইলে সিডনি থেকে লন্ডনের ফ্লাইটে ডেভিড বুনের কথিত ৫২ ক্যান বিয়ার খাওয়ার কীর্তিটা কি এত গর্বের সঙ্গে প্রচার পেত! জেমস অ্যান্ডারসনের বিদায়ের দিনও তো মাঠে সমর্থকদের সামনে গিনেসের পাইন্ট হাতে দেখা গেছে তাঁকে।

আসল ব্যাপারটা বোধ হয় নিজের সীমাটা চিনতে পারা। কখন মদ্যপান করা চলে আর কখন চলে না, পান করার পর কী করা যায় আর কী করা যায় না—এটুকু বোঝা। সবাই হুট করে মদ ছেড়ে দেবেন, এমন আশা করাটা বোকামি। মার্ক উডের মতো ব্যতিক্রম অবশ্যই থাকবেন। স্টোকস নিজেও ২০২৫ অ্যাশেজের আগে হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট সারানোর সময় মদ পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছিলেন, টানা কয়েক মাস এক পেগও ছোঁননি। কিন্তু সবাই সেই পথে হাঁটবেন—এমন ভাবাটাও বোকামিই।

তাহলে কি কঠোর পথই একমাত্র সমাধান? কারফিউ দিয়ে দেখা হয়েছে, তাতে কাজ হয়নি। ভন কঠিন শাস্তির কথা বলছেন, কিন্তু সেটাই বা কতটা কাজে দেবে—প্রশ্ন তোলাই যায়। শাস্তি তো কারও কারও কম হয়নি আগেও। শেষ পর্যন্ত হয়তো ইংলিশ অধিনায়ক জো রুটের কথাটাই সত্যি, ‘মাঠের বাইরেও সবাইকে পরিণত বয়স্ক হিসেবে আচরণ করতে হবে।’

না হলে কিছুদিন পরপর ‘নাইটক্লাব–কাণ্ড’ ধরনের শিরোনাম হতেই থাকবে।

সূত্র: প্রথম আলো

৫ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

ফুটবল ক্লাবের মালিকদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী কে

ফুটবল ক্লাবের মালিকদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী কে